পাগলের খপ্পড়ে

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:২৪

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

শীত আসি আসি করে অবশেষে চলেই এলো। এমন শীতময় একদিন সাতসকালে টাকলা ওরফে তোতা চাকলাদারের দোকানে চায়ের আড্ডা বসাল হিরু ও গং!

তোতা চাকলাদার আরাম পেয়ে গায়ে পাতলা কম্বল চাপিয়ে আরামের ঘুম ঘুমাচ্ছিল। হিরুরা সকাল সকাল এসে তার ঘুম ভাঙাল। চাকলাদার নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠল বটে, কিন্তু চোখে ঘুমের লাই লেগে রইল। তখন হিরু হুংকার দিয়ে উঠল, ‘এই সকালে আমরা তোমার হাতের স্পেশাল চা খেতে এসেছি। আর তুমি যদি ঝিমাও, তাহলে কিন্তু আমরা তোমার গায়ে গরম পানি ঢেলে দেবো, এই বলে দিলুম।’

‘এই সাত সকালে তোমরা গরম পানি কই পাবা? পানি গরম করার জন্য তো আমাকেই লাগবে। হাঃ হাঃ!’ চাকলাদার চোখ ডলতে ডলতে বলল।

হিরু ভাব দেখিয়ে বলল, ‘গরম পানি সংস্থান করা কোনো ব্যাপার নাকি! প্রথমে তোমার চা গরম করার স্টোভ থেকে কিছুটা কেরোসিন তেল বের করে নেবো। সেগুলো ঢালব তোমার কম্বলে। কম্বলে আগুন ধরিয়ে তার ওপরে কেটলি বসিয়ে দেবো। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি টগবগ করে ফুটতে শুরু করবে। তখন কেটলির অর্ধেক পানি ঢেলে দেবো তোমার গায়ে...!’

কলজেটা কেঁপে উঠলেও চাকলাদার প্রশ্ন করতে ভুলল না, ‘আর কেটলির বাকি পানিটা?’

‘ওটা ব্যবহার করব চা বানাতে! হেঃ হেঃ তুমি ভেবেছিলে এই কথা বলব, তাই না? চা যদি নিজের হাতে বানিয়েই খেতে হয়, তাহলে আর তোমার দোকানে কেন এলাম! আসলে, বাকি পানি দিয়ে জলন্ত কম্বলটা নেভাব। বোঝা গেছে ব্যাপারটা?’

চাকলাদারের চোখে ঘুমের রেশ তখনই বাপ বাপ করে পালাল। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘পড়েছি পাগলের হাত, চা খেতে হবে সাথে!’

চা বানিয়ে সকলের হাতে তুলে দেওয়ার পর চাকলাদার তার বুকে বল ফিরে পেল যেন। এতক্ষণ কেন জানি হিরুরা বেশ রাশগম্ভীর হয়ে বসেছিল। একটা কথাও মুখে আনেনি কেউ। চাকলাদার শুধালো, ‘তা হিরু মহাশয়, এই সাত সকালে দলবেঁধে চা খেতে এসেছ, নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ আলাপ-সালাপ আছে?’

‘তা তো বটেই।’ এতটুকু বলেই আবার চায়ের কাপে সুড়ুত্ সুড়ুত্ টান দিলো হিরু।

চাকলাদারের আগ্রহ কমল না, বরং বেড়ে গেল কয়েকগুণ। এই কৌতূহল এমনই যে, হিরুরা যদি সাত সকালে বউনির টাকাটা না দিয়েও চলে যায়, তাতেও চাকলাদারের মন খারাপ হবে না। কিন্তু মনের খচখচানি দূর করা চাই-ই চাই। সে মিনমিন করে বলল, ‘কারণটা কী বলা যাবে?’

‘হিরু এবার নির্বাচনে দাঁড়াবে।’ একজন সোত্সাহে বলে উঠল।

অমনি হিরুর চা মস্তকে উঠল। সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে না। ওরা মজা করছে।’

‘মজা না হিরু ভাই। আমরা খুব করে চাইছি তুমি এমপি ইলেকশনটা করো। তুমি রাজি হলেই মনোনয়ন ফরমটা তুলে ফেলতে পারি।’

হিরু কোনো প্রত্যুত্তর না করে মিটিমিটি হাসতে লাগল।

চাকলাদার অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কি সত্যিই দাঁড়াবে হিরু? আমার ভোটটা তাহলে কিন্তু তোমাকেই দেবো।’

হিরুর হাসি দ্বিগুণ হলো। ইতস্তত বলল সে, ‘দেখো দেখি, কোনসব পাগলের খপ্পড়ে পড়েছি!’

অন্যরা তখন চেঁচিয়ে উঠল, ‘সে যাই বলো আমরা তোমাকে এবার এমপি ইলেকশনে দাঁড় করাবই। কতসব পাগল-ছাগল নির্বাচনের নমিনেশন পেপার তুলছে, আর তোমার মতো হেভভি জনপ্রিয়, হেভিওয়েট প্রার্থী নির্বাচন করবে না, তা হবে না। তুমি যাই বলো না কেন, পালিয়ে বাঁচতে পারবে না।’

একজন বেশি উত্সাহ দেখিয়ে বলল, ‘নির্বাচনের প্রচারণাকালীন চাকলাদার ভাইসাবের চায়ের দোকান সবার জন্য ফ্রি করে দেওয়া হবে।’

এবার চাকলাদার কিছুটা বিষম খেলেও চুপ হয়ে রইল। নির্বাচনের ব্যাপার বলে কথা। বল কোন কোর্টে যায়, তা না বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানো বোকামো।

আরেকজন বলল, ‘আমার মামার তামাক পাতার আড়ত্ আছে। তোমরা সবাই সেই তামাক পাতার বিড়ি বানিয়ে হিরু ভাইয়ের তরফ থেকে পাবলিকের মাঝে বিলি করে দেবে।’

‘আমরা হবো বিড়ির কারিগর?’ একজন কিছুটা প্রতিবাদ করে উঠল।

‘আরে, হিরু ভাইয়ের জন্য এতটুকু করতে পারবা না?’ অন্য আরেকজন যৌক্তিকতা দেখানোর চেষ্টা করল।

প্রতিবাদকারী এবার চুপসে গেল।

চাকলদার বিড় বিড় করে বলল, ‘কিন্তু নির্বাচনকালীন বিড়ির ব্যবহার যে এবার থেকে নিষিদ্ধ!’

আরেকজন ত্বরিত বলল, ‘তাহলে তোমার দোকানে আনলিমিটেড মুড়ির ব্যবস্থা রাখবে। সবাই চায়ের সাথে বিড়ি না ফুঁকে এবার মুড়ি ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাবে। কাঁটা চামচও রেখো কিছু। নাহলে মুড়ি খাবে কী করে?’

‘মুড়ি খেতে খেতে আবার কাঁটা চামচও না খেয়ে ফেলে!’ হিরু বিড় বিড় করে বলল।

‘কিছু বললে হিরু ভাই? তাহলে তুমি রাজি তো?’ একজন হিরুর পাকা কথা জানতে চাইল।

হিরু মুখে কিছু বলল না স্বগতোক্তি করল, ‘সাতসকালে খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছি। অবশ্য কুমির হলেও ভালো ছিল। এগুলো তো পাগলের দল। এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়তে হবে।’

এই দলতার মাঝে যে বয়সে একটু সবার সিনিয়র, তার নাম আনোয়ার। সে এবার মুখ খুলল, ‘তোরা বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াসলি ভেবেছিস তো? নির্বাচন কিন্তু সহজ কথা নয়। অনেক প্রার্থীই ভাব দেখিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ায় বটে, কিন্তু আদতে তাদের শুধু হারই নয়, জামানত হারানোরও শঙ্কা থাকে। একথা ঠিক যে, হিরু আমাদের চ্যালাপুরে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু তাকে এমপি নির্বাচিত হতে হলে তো পুরো আসনেরই জনমানুষের ভোট পেতে হবে, নাকি?’

তার প্রশ্ন শেষে চায়ের আড্ডায় কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করল। এবার যেন হিরু দম ফেলার সুযোগ পেল। চাকলাদারকে আরেক কাপ চা দিতে বলল সে।

‘হিরু ভাইকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার সব উপায় আমাদের জানা।’ অনেকক্ষণ পরে একজন মুখ খুলল। হিরুর মুখের চা আবারও মস্তকে ওঠার পালা।

হিরু কোনো প্রশ্ন করার আগেই সে বলতে লাগল, ‘হিরু ভাইয়ের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে বৈকি কমছে না। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর, আমরা সবাই মিলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের জনপ্রিয়তা কমানোর ব্যবস্থা করব।’

‘অন্যদের জনপ্রিয়তা কীভাবে কমাবে, হে?’ চাকলাদার জানতে চাইল।

‘আমরা এবার নির্বাচনে নিষিদ্ধ বিড়ি সাপ্লাই করব। কিন্তু সেটা হিরুর নামে নয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের নামে। আর হিরু ভাইয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে ফুল দেবো।’

‘বুদ্ধি খারাপ না।’ সবার সিনিয়র আনোয়ার বলল। ‘কিন্তু এত এত ফুল কই পাবি তোরা? যশোর থেকে আমদানি করতে হবে বোধহয়।’

‘ফুলের জন্য টেনশন করবেন না ভাই। নিরুপমাদের ফুলের বাগান আছে না! অর্জুন ওখান থেকেই সকল ফুল সাপ্লাই দেবে।’

এবার সবার বিষম খাবার পালা। ওরা সবাই জানে, অর্জুন নিরুপমার জন্য পাগল।

মোস্ট সিনিয়র আনোয়ার বলল, অর্জুনের উচিত ওর হবু প্রেমিকাকে বেশি বেশি ফুল দেওয়া। উল্টো ওই কিনা নিরুপমার ফুল বাগান থেকে ফুল চুরি করবে!’

অর্জুন ছেলেটা এবার মুখ খুলল। সে অতি উত্সাহ দেখিয়ে বলল, ‘সে আমি ঠিকঠিক ম্যানেজ করে নিতে পারব ভাই!’

মোস্ট সিনিয়র আনোয়ার বলল, ‘কিন্তু চুরি ব্যাপারটা কেমন জানি। এটা উচিত হবে না। নেতারা টাকা-পয়সা চুরি করে। টিআর, কাবিখা, কাবিটার বরাদ্দ মেরে খায়। আর হিরু কিনা এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগেই ফুল চুরির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে!’

‘এতে ভালোই হবে ভাই। হিরু ভাইয়ের ইমেজ বাড়বে। পাবলিক ভাববে এমন ফুল চোরকেই বরং নির্ভাবনায় ভোটটা দেওয়া যায়! সে ফুল চোর, টাকা চোর তো আর নয়!’

‘ফুল দেওয়ার ব্যাপারটা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু পাবলিক ফুল নিয়ে করবেটা কী? তারা তো আর ফুলের মর্ম বুঝবে না। বরং তারা বুঝবে বিড়ির গুরুত্ব। যে তাদের বিড়ি দেবে, ভোটটা তার মার্কাতেই পড়বে।’ চাকলাদারের এই কথার বিপরীতে আর কোনো জবাব এলো না।

হিরু এবার ভীষণ খুশি হলো। ‘বুঝলে তো চাকলাদার ভাইসাব, এগুলা সব পাগলের দল। এদের খপ্পড়ে পড়েছ তো, তুমি শ্যাষ! দেখলে না সেই সূর্যের আলো ফোটারও কত আগে আমার ঘুম ভাঙিয়েছে, বাদ পড়লে না তুমিও! এখন তো মনে হচ্ছে—স্বয়ং আমিই পাবনার পাগলাগারদে এসে পড়েছি!’

হিরু এই কথা বলা মাত্রই কোত্থেকে একটা প্যাকেট এসে ওদের জটলার ঠিক মাঝ বরাবর পড়ল।

‘আমারে পাগল কইল কুন পাগলে?’ অদূরে এক লোককে গজগজ করতে দেখল সবাই। হিরু লোকটাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। কিন্তু লোকটা একচুলও নড়ল না। সে উচ্চৈঃকণ্ঠে বলল, ‘উঁহু আসব না। আমারে পাগল পাইছ নাকি? আগে কও—আমারে পাগল কইল কুন পাগলে?’

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘আমিই বলেছি। এবার তো এদিকে আসতে পার, নাকি?’

চাকলাদার বিড়বিড় করে বলল, ‘হিরু ভাই, নুরা পাগলারে এদিকে আসতে বইল না। ও কিন্তু আসলেই পাগল।’

নুরা পাগলা বলল, ‘উঁহু, ওহানে যাব না। ওহানে বোম্ব মারছি। তুমরা আমারে পাগল পাইছ নাকি? তুমাদের ওহানে যাই আর বোম্ব ফাইটা তুমাদের লগে লগে আমিও উইড়া যাই আর কী!’

‘বোমা’ শুনে সবার মাঝেই কাঁপাকাঁপি শুরু হলো। তারা মোটামুটি দৌড় লাগানোর প্রস্তুতি নিলেও হিরু চুপচাপ বসে রইল।

অন্যদিকে নুরা পাগলা উচ্চৈঃকণ্ঠে আওড়াতে লাগল, ‘তিন... দুই... এক... ধুম!’                                                    (চলবে)