অমর একুশে বইমেলাকে বলা হয় বাঙালির মিলনমেলা, বাঙালির প্রাণের মেলা। লেখক, পাঠক, প্রকাশক—এই তিনের মিলনমেলা। নতুন নতুন রঙিন মলাটে কত নতুন বইয়ের অভিষেক ঘটে এই মেলায় তার কোনো হিসেব নেই! মেলাজুড়ে শুধু বই আর বই। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু ভাষার মাসের গণ্ডি পেরিয়ে গেলে অনেক বইপ্রেমীই বইয়ের স্বর্গরাজ্যের খোঁজ করেন। তার মধ্যে অন্যতম নীলক্ষেত, মিরপুর ও বাংলাবাজার। জায়গাগুলোতে যেন সারাবছরই চলে বইমেলা!
নীলক্ষেত বইয়ের রাজ্যে
আহসান জোবায়ের
সুবিন্যাস্ত সারিসারি বই, রঙ-বেরঙের বইয়ের উঁচু স্তুপ করে রাখা রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকার ফুটপাতে। নতুন পুরোনো সব বই মেলে এখানে। এখানে কয়েকশ’ বইয়ের দোকান রয়েছে, যা বই কেনাবেচার ব্যবসায় জড়িত।
নিউ মার্কেটের বিপরীত পাশে নীলক্ষেত মোড় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ পর্যন্ত বিস্তৃত নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের বাজার। এসব দোকানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় উপন্যাস, রিসার্চ পেপার, জার্নাল, রেফারেন্স বই, নামীদামি দেশি-বিদেশি লেখকের বই, দেশি-বিদেশি ম্যাগাজিন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন, বিশ্বখ্যাত নতুন পুরোনো সাহিত্যের বাংলা অনুবাদসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ক্যাটালগসহ নানা ভাষা শিক্ষার বই পাওয়া যায় এখানে। রাজধানীর নিউমার্কেট বা শাহবাগ থেকে খুব বেশি দূরে নয় জায়গাটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে কিছুদূর গেলেই মিলবে নীলক্ষেত মোড়। নীলক্ষেত নামটি বই আর শিক্ষাসামগ্রীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রাজধানী ও এর আশেপাশের প্রায় সবাই বই কিনতে ছুটে যায় নীলক্ষেতে। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গার নাম নীলক্ষেত।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশরা এই অঞ্চল ত্যাগ করার পর ১৯৬১ সালে নীলক্ষেত এলাকায় গড়ে ওঠে বস্তি। এই বস্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ছোটখাটো দোকান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ—এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই বিক্রি শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। ধীরে ধীরে জমে উঠতে শুরু করে বইয়ের মার্কেট। যার প্রায় পুরোটাই লেখাপড়ার সামগ্রী নিয়ে। কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোকপি, বই, খাতা-কলম ইত্যাদি মূল হলেও সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু খাবারের দোকানও। বর্তমানে প্রিন্টিং প্রেসের জন্যও নীলক্ষেতের রয়েছে বেশ খ্যাতি। ইসলামিয়া, বাকুশাহ, শাহজালাল, সিটি কর্পোরেশন ও বাবুপুরা—এই ৫টি মার্কেট মিলিয়ে নীলক্ষেতের বইয়ের বাজার। বইয়ের দোকান প্রায় সাড়ে সাতশ’।
নীলক্ষেত যেমন বিখ্যাত নতুন বইয়ের জন্য তেমনই পুরনো বইয়ের জন্যও। বই কেনার পাশাপাশি পুরোনো বই বিক্রি করতেও আসেন অনেকে। নীলক্ষেতের ফুটপাতের পুরোটাই ঘিরে আছে পুরোনো বইয়ের দোকানে। বইগুলো নানাভাবে সংগ্রহ করা হয়। সবই যেহেতু পুরোনো বই, তাই এগুলো কেউ না কেউ বিক্রি করার পরই নীলক্ষেতের বাজারে আসে। সাধারণত ভাঙারির দোকান, বাংলাবাজার ও ফেরিওয়ালার কাছ থেকেই বইগুলো বাজারে আসে। মাঝে মধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগার থেকেও পুরোনো সংস্করণের বইগুলো আনা হয়। অনেকে আবার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইও বিক্রি করেন। বিক্রেতার ভিড়েও হিমশিম খেতে হয় সবাইকে। নতুন বইয়ের অর্ধেক মূল্যে কিনতে পাওয়া যায় প্রায় সব বই। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, ইতিহাস আর একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় অনেক আন্তর্জাতিকমানের বই। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, ভার্সিটির বইসহ প্রায় সব বইয়ের সমাহার রয়েছে এখানে।
নীলক্ষেতের বইয়ের মার্কেটে বেশকিছু খাবারের দোকানও রয়েছে। সারাদিন বেশ জমজমাট থাকে ফুটপাত ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোকানগুলো। সব খাবার পাওয়া গেলেও তেহারি আর কাচ্চির জন্য বিখ্যাত এই দোকানগুলো। নীলক্ষেতে আসা ক্রেতারা এখান থেকেই আহার করেন। ছোটগলির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে নীলক্ষেত মার্কেট। প্রথমবার কেউ ঢুকলে তাকে ভয় পেতেই হবে। অন্ধকার গলির শুরু কিংবা শেষ সহজে বোধগম্য নয়। তার চেয়ে বড় আশঙ্কা পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠা পাকা, আধাপাকা কিংবা কাঁচা দোকানগুলো চলছে ঝুঁকির মধ্যেই।
নীলক্ষেতের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে ছিল দ্বন্দ্ব। ১৯৮২ সালে নীলক্ষেত মার্কেটের জমির মালিকানা নিয়ে মামলা হয়। ১৯৯৪ সালে এটি খাসজমি হিসেবে কোর্টের রায় হয়। ১৯৯৬ সালে নিলামে জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত হলেও তা সম্ভব হয়নি। এরপর দখল বিবেচনায় সরকারি রেটে বিক্রি করার কথা হলেও আজো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাবাজারের পর নীলক্ষেতই এখন দেশের সবচেয়ে বড় খুচরা বইয়ের বাজার। পুরোনো বই বিক্রির মধ্য দিয়ে বাজারটির যাত্রা শুরু হলেও উচ্চশিক্ষার প্রচুর বিদেশি নতুন বইও এখানে পাওয়া যায়।
বইপ্রেমীদের স্বর্গ বাংলাবাজার
নাকিবুল আহসান নিশাদ
বাংলা বাজারকে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের আগ থেকে বিদ্যমান ছিল বলে মনে করা হয়। রোমান নাগরিক ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে লিখে গেছেন যে, বিশ্বের সবচেয়ে উত্কৃষ্টমানের সিল্ক ও সুতো তৈরি হতো এই ‘বাঙ্গলা’ নগরে। এর মাধ্যমেই বাঙ্গলার কেন্দ্রস্থল বাংলাবাজারের ইতিহাস সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। দেশের বৃহত্তম বইয়ের বাজার হিসেবে বাংলাবাজারকে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও এখানে অনেক ছাপাখানা এবং দেশে নাম করা সব প্রকাশনীর মূল অফিস রয়েছে। বইপ্রেমীদের আনাগোনা আর বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক কাজের জন্য জায়গাটি সকাল থেকে রাত অবধি ব্যস্ত থাকে। বাংলাবাজারের ভেতর প্রবেশ করলেই শোনা যাবে ছাপাখানা থেকে ভেসে আসা বই ছাপানো মেশিনের আওয়াজ, যা বাংলাবাজার বা এর আশেপাশে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
ব্রিটিশ আমলে বাংলাবাজার অঞ্চলটি খুব সমৃদ্ধশালী এলাকা হয়ে ওঠে তার কারণ হিসেবে দেখা যায় বহু ইংরেজ কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী এর আশেপাশেই বসবাস করতেন। ব্রিটিশ আমলে বাংলাবাজার এলাকায় টাকা-পয়সা ভাঙানো বা বদলানোর ব্যবসা শুরু হয়। বাংলাবাজারের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি বাংলাবাজার সড়ক নামে পরিচিত। এর আশেপাশে রাস্তাগুলো দেখলে দেখা যায় সদরঘাট টার্মিনালে যাওয়ার এবং পুরান ঢাকার অন্যতম স্থান ইসলামপুর যাওয়ার রাস্তাটি বাংলাবাজার সংলগ্ন।
বর্তমানেও বাংলাবাজার ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার একটি। এখানে নানা ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি হয়। বর্তমানে বাংলাবাজার বাংলাদেশের বই বিক্রি, বই ছাপানো ও সরবরাহ করার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। বাংলাবাজার বাংলাদেশের মধ্যে বইয়ের বৃহত্তম মার্কেট। এখানে ১,২০০ থেকে ১,৩০০ বইয়ের দোকান রয়েছে। এছাড়াও বাংলাবাজারের আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের খাবার হোটেল চোখে পড়ে। আপনি যদি সারাদিন বই খোঁজার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাহলে এখানে বসে খাবার সেরে নিতে পারবেন। এছাড়াও বাংলাবাজারের পাশেই সদরঘাটের বৃহত্তর পাইকারি কাপড়ের বাজার থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় জায়গাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের কর্মব্যস্ততায় মুখরিত থাকে।
বাংলাবাজার এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি যেকোনো ধরনের বই চাইলে আপনাকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে না। ছোটদের বই থেকে শুরু করে দেশবরণ্য বিভিন্ন লেখকের গল্পের বই, হাদীস-কোরআন সব পাওয়া যাবে এখানে। এছাড়াও বাংলাবাজারের একটি অনত্যম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে আপনি খুব কমদামে পুরাতন বই কিনতে পারবেন। বাংলাবাজারের শুরুতের কিছু দোকান পাওয়া যায় যেখানে পুরাতন বইগুলা প্রায় অর্ধের দামে ক্রয় করা যায়। এসব দোকানের মধ্যে যেমন আপনি পাঠ্যবই পাবেন তেমন পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখকের গল্পের বই। বাংলাবাজারের ইতিহাস যেমন অনেক কাল থেকে বাংলা বিখ্যাত ঠিক তেমনি বইপ্রেমীদের জন্য বাংলাবাজার আজো মানুষের হূদয় অন্যতম একটি জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়।
নীলক্ষেতের মতোই আমেজ মিরপুরে
সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল
মিরপুরের জ্যামের ধকল কাটিয়ে অনেকের নীলক্ষেত আসাটা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। নীলক্ষেতের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কল্যাণে মিরপুরও এখন বইয়ের আরেক ঠিকানা। বইয়ের সন্ধানে সেখানে ছুটে যান নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং কমপ্লেক্সের পূর্ব পাশের এ বাজারটিতে রয়েছে নীলক্ষেতের মতোই আমেজ। ক্রেতা সমাগমে প্রতিদিন জমে থাকে এলাকাটি। নীলক্ষেতের মতো অসংখ্য বইয়ের সংগ্রহ সেখানে না থাকলেও পাঠক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম সেখানকার বিক্রেতারা। তারা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের বই আছে এখানে। আর পাঠক চাইলে যেকোনো বই আমরা এনে দিতে পারি।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে বইয়ের বাজারটি উচ্ছেদ করা হয়। পরে পুলিশ তাদের পুনর্বাসনের জন্য রাজারবাগে বইয়ের দোকান বসানোর সুযোগ দিয়েছিল। সেখানে মনমতো ব্যবসা না হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এলিফ্যান্ট রোডে বইয়ের হলিডে মার্কেট করার ব্যবস্থা করে পুলিশ। পরে দীর্ঘদিন বইয়ের দোকানে কাজের অভিজ্ঞতায় মো. লিটন প্রথম মিরপুরে ছোট পরিসরে বইয়ের দোকান চালুর উদ্যোগ নেন।
ফুটপাতের ওপর পাটি বিছিয়ে ১০০-১২০টি বই নিয়ে শুরু করেন দোকান। তারই হাত ধরে সেখানে এখন ৩২টি বইয়ের দোকান বসেছে। মিরপুর এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ প্রায় ৪ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বসবাস করছে প্রায় ২০ লাখ মানুষ।
দোকানগুলোতে সব ধরনের বই পাওয়া যায়। তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো বই না পাওয়া গেলে পরে তার ব্যবস্থা করা হয়। মিরপুর বই বাজারের প্রথম ব্যবসায়ী মো. লিটন বলেন, ‘শুরুতে একা একা লাগলেও বিক্রি খারাপ হতো না। অনেকেই আমার কথায় রাজি হয়ে নীলক্ষেত ছেড়ে চলে আসে। এখানে বইয়ের ব্যবসাটা এখন ভালোই জমে উঠেছে।’
