শফিকুর রহমান রয়েল
গ্রিক সনাতনপন্থি রিটা স্ট্যানবাউলি। বেকা উপত্যকায় জাহলে নামক যে ছোট্ট শহরটিতে তিনি থাকেন, সেখানে যেতে হলে রাজধানী বৈরুত থেকে পূর্ব দিকে ঘণ্টাখানেক সময় গাড়ি চালাতে হয়। এক অতিথি যথন তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন তিনি ছিলেন মামৌল তৈরিতে মহাব্যস্ত। উপলক্ষ্য ইস্টার সানডে। লাল ছাদের এ শহরের চতুর্দিকেই তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল গির্জার ধর্মোপদেশ। ইস্টার সানডে-তেই শুধু নয়; বড়দিন, মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর আসা বহুল প্রতীক্ষার ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা, সব উপলক্ষ্যেই মামৌল থাকা চাই-ই চাই। এটিকে বিশেষ একধরনের বিস্কুট, পিঠা অথবা মিষ্টান্নও বলা চলে। রিটা তখন মাখা ময়দার তালের পকেটে পুরছিলেন খেজুরের কাইয়ের গোলক। তারপর সেটিকে আবার ঢেকে দিয়ে কাঠের ছাঁচে ঢুকিয়ে প্রত্যেকটিতেই ফ্রাই প্যানে বসাচ্ছিলেন উলটো করে এবং তা গ্যাসের চুলোয় আগুন ধরানোর আগেই। বিস্কুট প্রস্তুত হওয়ার মাঝের সময়টাতে তিনি বলছিলেন, ‘যাকে বলে আসল মামৌল, সেটি এ বছর বানাতে পারছি না আমি। সবদিক থেকে আমরা চাপের মধ্যে আছি। এমন অবস্থায় সবচেয়ে মজার মামৌল বানানোটা হবে বিশাল বিলাসিতা। তবুও ভাগ্য ভালো যে, আমি বানাতে পারছি। অসংখ্য পরিবারের সদস্যরা দেশের ঐতিহ্যবাহী এ খাবার খাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছে না এখন।’
রিটা স্ট্যানবাউলি একদমে বলে যাচ্ছিলেন, ‘অধিকাংশ লেবাননবাসী এখন আমার মতোই দারিদ্র্যকে বেশ ভালোভাবেই অনুভব করছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বলতেই হয় যে, আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি। আগে কখনোই আমরা এমনভাবে জীবনযাপন করিনি, যা এখন করছি। সরকার আমাদের জন্য প্রতিমাসে মাত্র একবার মুরগির মাংসসহ অন্য আরেকটি মাংসের বন্দোবস্ত করে।’ রিটা একটি হাসপাতালে সেক্রেটারির কাজ করেন। অর্থনৈতিক মন্দা শুরুর পর থেকে সর্বসাকুল্যে পাওয়া তার বেতনের পরিমাণ মূল্যের বিচারে প্রত্যেক মাসেই নিচের দিকে নামছে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। দুই সন্তানের জননী রিটার স্বামীও চাকরি করেন। মাস পেরুলেই বাড়ি ভাড়া বাবদ তাদেরকে সম্মিলিত মোট বেতনের বড় একটা অংশ গুনতে হয়। এরপর অর্থের যে অঙ্কটা থাকে, সেটিকে কিছুতেই পর্যাপ্ত বলা চলে না। মামৌল তৈরি ও খাওয়ার বেলায় পেস্তা বাদামের পরিপূরণ তার সবচেয়ে পছন্দের। কিন্তু দাম খুব বেশি হওয়ায় এ বছর আর এই বিশেষ উপকরণটি দিতে পারেননি। সত্যি বলতে, তিনি যে মামৌল তৈরি করেছিলেন, সেটি কেবল নামকাওয়াস্তে। উপরোন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম বানিয়েছিলেন। ঘিয়ের দাম একেবারে আকাশচুম্বী হওয়াতে এর বদলে যুক্ত করেছিলেন সরকারের ভর্তুকি দেওয়া মাখন। ঘি কিনতে গেলে তার মোট বেতনের এক-তৃতীয়াংশই নাকি চলে যেত। সেজন্যেই অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এই বিলাসী পণ্যটি কেনার দুঃসাহস দেখাননি।
অন্য সবকিছুর মতো খাদ্যদ্রব্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে কেবলই বাড়ছে। বাজারের ব্যাপারে একই সঙ্গে ঘটছে রাজনীতিকরণ। একে তো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তার ওপর জনগণের অর্থের মান পড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতোই আবার ব্যাংকগুলো সব লাটে উঠেছে। যে কারণে একেবারে অপরিহার্য হয়ে উঠলেও জনগণ তাদেয় সঞ্চয় তুলতে পারছে না। ফলে ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া লোকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। উন্নয়ন ও সাহায্যবিষয়ক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘সাওয়া’ দীর্ঘদিন ধরে সিরীয় শরণার্থী ও নাজুক অবস্থায় থাকা লেবাননীয়দের সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছে। ইদানীং তাদের কাছে ক্রমাগতই দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বেকা উপত্যকার আরো অধিকসংখ্যক লোককে সাহায্য করার। এ ব্যাপারে সংগঠনটিও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের সাহায্যের হাত আরো প্রসারিত করার।
ক্রমশই খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে লেবাননের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের বেশ বড় অংশই বরবাদ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিবাদ মেটানোর পেছনে। গত বছরের শেষদিকে নিজেদের অবস্থা তেমন ভালো না থাকা সত্ত্বেও ইরাক সাহায্যস্বরূপ গম পাঠায় দেশটিতে। কিন্তু জানা গেছে, সেই গমের চালান জনসাধারণের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার বদলে যাচ্ছেতাইভাবে ফেলে রাখা হয়েছে একটি ফুটবল স্টেডিয়ামে। ২০০০ সালে আগস্টে বৈরুত বিমানবন্দরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণের জন্যে চা দান করেছিল শ্রীলঙ্কা। কিন্তু সেই পানীয়ের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পায় রাষ্ট্রপতির রক্ষী দলের পরিবারবর্গের সদস্যরা। লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্ শহর ত্রিপোলিতে (লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি নয়) এক স্বেচ্ছাসেবক খাবারের প্যাকেট বিতরণের সময় ধস্তাধস্তি ছড়িয়ে পড়লে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সুপার মার্কেটগুলোতে সরকারের ভর্তুকি দেওয়া খাদ্যদ্রব্য বাগিয়ে নিতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াটা বর্তমান লেবাননের এক অতি সাধারণ ঘটনা এখন। রিটা স্ট্যানবাউলি এমন ঘটনা বেশ কয়েকটি দেখেছেন। এ বিষয়ে তার উপলব্ধি হচ্ছে, সবাইকে শেষপর্যন্ত দেওয়া যাবে না এবং সম্ভবও নয়, এই আতঙ্ক থেকেই মারামারির সূত্রপাত হয়। জনগণের মধ্যে আরেকটি বিষয় সব সময় কাজ করে, সরকারের পক্ষে বেশি দিন আর এই ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
দেশের দুর্দশার স্তূপ জমলেও রাজনৈতিক দলগুলো সার্বজনীন চিন্তা থেকে বিরত থাকছে। তারা নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নিজেদের দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে। শিয়া ইসলামি রাজনৈতিক ও জঙ্গি সংগঠন হিজবুল্লা আল-সাজ্জাদ নামক আলাদা সুপার মার্কেট উদ্বোধন করেছে। আর্থিকভাবে অরক্ষিত পরিবারসমূহের জন্যে বিশেষ একটি কার্ড চালু করেছে। এই কার্ডটি দেখাতে পারলে ইরান, ইরাক ও সিরিয়ায় সস্তা ও ভর্তুকি দেওয়া বিভিন্ন পণ্য কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। সংখ্যার বিচারে এই তিনটি দেশেই শিয়া ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। কাজেই রিটা তো বটেই সুন্নিরা পর্যন্ত ঐ সুপার মার্কেটগুলোতে যেতে পারছে না। তার দাবি, সরকারেরও উচিত এমন উদ্যোগ নেওয়া। কেননা সবারই খেয়েপরে থাকার অধিকার রয়েছে।
অতি সম্প্রতি টেলিভিশন সেলিব্রেটি ও বেসরকারি সংগঠন লেবানন অব টুমরোর দূত জোসেফ টাওক তার দলকে নিয়ে ৯ হাজার মামৌল তৈরি করার পর সেগুলো জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছেন। জনকল্যাণমূলক এই সংগঠনটি প্রায়ই দেশব্যাপী খাদ্য ও ওষুধ বিতরণ করে থাকে বিনা মূল্যে। মামৌল হস্তান্তর করার সময় তিনি হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘এই মামৌল লেবাননকে রক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু একদিনের জন্যে হলেও হাসিতো ফোটাতে পারবে। এর বদলে আগামীকাল হয়তো দেওয়া হতে পারে চাল কিংবা প্যারসিটামলের বাক্স।’ গেল বছর করোনা প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে চার দিনব্যাপী লকডাউন চলার মাঝেই নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টানরা উদ্যাপন করেছিল ইস্টার সানডে, আর মুসলমানরা সারা দিনের রোজা ভাঙছিল যার যার সাধ্যানুযায়ী ইফতারির মাধ্যমে। অবস্থা স্বাভাবিক হলে ঐ সময় মুসলমান ও খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সবার পাতেই উঠত মামৌল। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অনেকে হয়তো নামেমাত্র ঐ বিস্কুট দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মুখে লেগে থাকার মতো আসল মামৌলের স্বাদ নিতে পেরেছিলেন খুব কম জনই, এটি নিশ্চিত। লেবাননের ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি যথাযথভাবে বানাতে গেলে প্রয়োজন পড়ে সুজি, চিনি, গোলাপ জল, পেস্তাবাদাম, আখরোট ও খেজুর। এতগুলো জিনিসের সম্মিলন ঘটানো বর্তমান লেবাননে অতি নগণ্যসংখ্যক লোকের পক্ষেই সম্ভব, কেননা দেশের অর্থনীতি যে ক্রমাগতই নিম্নমুখী।
—বিবিসি নিউজ অনুসরণে
