মো. আমিরুজ্জামান
সৈয়দপুর (নীলফামারী)
নীলফামারীর সৈয়দপুরের বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের হিন্দুপাড়ার বট-পাখর দম্পত্তি গাছের মগডালে খড়কুটো দিয়ে বাসা বানিয়ে নির্ভয়ে বসতি গড়েছে শামুকখোল। এতে বিলুপ্ত প্রায় শত শত শামুকখোল পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠছে এই এলাকার আকাশ-বাতাস।
জানা যায়, এই এলাকার কালিপদ রায়ের বিশালাকার দুটি জমজ গাছে প্রায় ৮ বছর আগে শতাধিক শামুকখোল পাখি বসতি গড়ে। বট ও পাখর গাছ দুটির উঁচু মগডালে নিজেরাই খড়, ডালসহ অন্যান্য গাছের লতাপাতা সংগ্রহ করে বসবাস শুরু করে। প্রজননে ডিমের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটিয়ে এখন প্রায় হাজারখানেক শামুকখোল এ গাছসহ প্রতিবেশী বাঁশঝাড়ে বসবাস করছে। দিনদিন এদের সংখ্যা ও বসতির বিষয়টি দৃষ্টিতে পড়ে যায় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেতুবন্ধনের’।
এ সংগঠনের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বজলুর রশীদকে অবগত করেন। পরে সাথে সাথে এই এলাকাকে শামুকখোলের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এলাকাবাসী জানায়, এ এলাকাটি শহর থেকে দূরে ও পাখির বাসের পুরো ক্ষেত্র হিসেবে প্রস্তত রয়েছে। ব্যাপক বাঁশঝাড়, গাছ-গাছালি ও ব্যক্তিগত বনের মাঝে বসত গড়েছে নানা ধরনের দেশি পাখি। তবে এখানকার প্রাচীন একটি পাখর ও বটগাছ এ বাসস্থানকে সমৃদ্ধ করেছে। পরম মায়া-মমতা ও প্রেম-ভালোবাসায় মোড়ানো বেড়ে ওঠা গাছ দুটির মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিয়ে দিয়ে পাখির বিচরণ ক্ষেত্র যেন বৃদ্ধি করা হয়েছে। উঁচু উঁচু মগডালে খড়কুটো, ডালপালা ও লতাপাতা দিয়ে বোনা ঘরে এককোণে সোনালি বাঁদুড় ও বাকি অংশে প্রায় হাজারখানেক শামুকখোল বাস করছে। এ দম্পত্তি বৃক্ষদ্বয় যেন নীরব ভালোবাসায় সমর্থন করে যাচ্ছে পাখিদের বসতিকে।
দেখা যায়, দেখতে অনেকটা বকের মতো দেখতে শামুকখোল পাখি। প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতার এ পাখির তিন ফুটের মতো চওড়া ডানা। হাফ ইঞ্চির কম পুরু প্রায় ২ ইঞ্চি ঠোঁট দুটি অত্যন্ত শক্ত। এর কারণে তারা পানিতে হেঁটে সহজেই খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে।
ওবি নামের এক যুবক জানায়, প্রতিবছর এরা শীতকালে প্রায় ৩ মাস বাইরে কাটায়। এবার কেউ যায়নি। তবে কি কারণে এরা যায়নি জানতে চাইলে অনেক এলাকাবাসী জানান, এবার বেশিরভাগ বাসায় বাচ্চা ফুটিয়েছে। হয়তো বা তাদের যত্নেই সকল শামুকখোল খাদ্য সংগ্রহে ভিন্ন এলাকায় যাযাবর হয়নি।
এলাকার খোর্দ্দ বোতলাগাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিনা বেগম জানান, এই পাখিদের নজরে রাখা হয়েছে। কেউ যাতে এদের ক্ষতি করতে না পারে। আর এ দৃশ্য দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরাও আসছে।
শামুকখোলের খোলার রহস্যময় ঠোঁট। যার ব্যাখ্যা তার আচরণে পাওয়া যায় না। তবে এ পাখিটি Anastomus Oscitans বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত। যার অর্থ ‘হাই তোলা মুখ’। আর এর ইংরেজি নাম Asian Openbill Ev Asian Openbill Stork.
গবেষকদের মতে, পৃথিবীবীতে মাত্র ১ লাখ শামুকখোল পাখি রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানে রয়েছে তাদের আবাসস্থল। তবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় এখন শামুকখোলের কোনো প্রজনন ভূমি নেই। ভারতের প্রজনন ভূমিতেও প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে অনেক সময় শামুকখোলের প্রজনন বন্ধ থাকে। একটি হিসেবে পাওয়া যায়, আমাদের দেশে প্রায় ৩ হাজার শামুকখোল রয়েছে। এরমধ্যে শুধু সৈয়দপুরেই রয়েছে প্রায় ১ হাজারের বসতি।
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘বড় শামুকখোলরা বেশি খাদ্য খায়। পাশাপাশি বসবাসের জন্য বেশ পুরাতন লম্বা গাছ এদের প্রথম পছন্দ। তাই প্রাচীন গাছগুলোতে এরা বাসা বাঁধে। তবে পাখিটি অনেকটা দুর্লভ। এক সময় বাংলাদেশের সব জায়গায় শামুকখোল দেখা গেলেও এখন নেই। আর শামুকের প্রতি আসক্তির কারণেই এখানে শামুকভাঙা, শামুকখোর, শামুকখোল কিম্বা শামখোল নামে পরিচিতি পেয়েছে।’
একবার আংটি পরানো এক শামুকখোল ছানাকে থাইল্যান্ডে ছেড়ে দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে আবার দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে এসে পাওয়া যায়। এটি খুব দূরের ভ্রমণকারী না হওয়ায় এ রহস্যের ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এ নিয়ে মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এটি প্রায় বিলুপ্ত। খুবই কম দেখা মেলে পাখিটির। তাই এ পাখিটির যত্নসহ সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করার জন্য আমরা সচেতনতাসহ স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছি।’
সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘যেকোনো পাখি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাসহ মানুষের সকল ক্ষেত্রে উপকার করে। তাই শুধু শামুকখোলই নয়, সবুজ প্রকৃতিতে বিচরণকারী সব পাখিরই অভয়ারণ্য থাকা উচিত। আর এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন থেকে সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
