চয়ন

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:২২

 

বহুদিন আগের কথা। আমরা যখন স্কুলের ছাত্র, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষার আমূল পরিবর্তন সাধিত হইল। ১৯০৮ সাল হইতে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স কোর্স শুরু হইল। স্বদেশীয় যুগ। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় রাখিবন্ধনের দিনে রাস্তায় রাস্তায় ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে’ গাহিতে গাহিতে ঘুরিয়াছি। বাঙালির প্রথম কাপড়ের কলের চাকা ঘুরিতে আরম্ভ করিয়াছে। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের নতুনভাবে বিজ্ঞান শিক্ষার পরিকল্পনা ছেলেদের মুখে মুখে প্রচার হইতেছে। শিল্পোদ্যোগের জন্য বদ্ধপরিকর হইয়া দুই-চারজন বাঙালিও জাপান হইতে ফিরিয়া আসিয়াছেন।

১৯০৯ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়া স্থির করিলাম বিজ্ঞান পড়িব। জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কারের কাহিনি তখন বাংলা সাময়িকীতে প্রায়ই ছাপা হয়। জড়ের মধ্যে প্রাণশক্তির অস্তিত্ব তিনি পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রমাণ করিয়াছেন। সে কাহিনির প্রচার শুধু আমাদের দেশে নহে, অধ্যাপক নিজে গিয়া দেশ-বিদেশে সুধীমণ্ডলীর কাছে পেশ করিয়াছেন এবং তাঁহারা সম্ভ্রমের সহিত তাহা শুনিয়াছেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢুকিলে প্রথমেই এক কাচের ঘর নজরে পড়ে। তাহার মধ্যে রহস্যময় যন্ত্রপাতি লইয়া আচার্য জগদীশচন্দ্র গবেষণা করেন। কিশোর মনের বাসনা—এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর কাছে বিজ্ঞান শিক্ষা করিতে পারিলে জীবন ধন্য হইবে।

একতলার আরেক দিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রাসায়নিক গবেষণায় মগ্ন। এই দুই আচার্যের পায়ের কাছে বসিয়া বিজ্ঞানের প্রথম পরিচয় শুরু হইবে—এই আশায় আমার মতো বহু ছাত্র তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়িতে আসিল। প্রথম বত্সরে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের কাছে রসায়ন শিক্ষার সৌভাগ্য হইল।

কিন্তু জগদীশচন্দ্রের কাছে পড়িবার সুযোগ আসিল আরো দুই বত্সর বাদে। ইতিমধ্যে যাহারা একটু বেশি বাহিরের খবর রাখে, তাহাদের মতো আমিও মাঝে মাঝে লাইব্রেরিতে গিয়া Response in Living and Non-living-এর পাতা উলটাই। জগদীশচন্দ্রের গবেষণার তখন Magnetic Crescograph-এর যুগ। জগদীশচন্দ্রের নির্দেশমতো সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি প্রেসিডেন্সি কলেজের কারখানাতে তৈয়ারি হয়। আমরা তাঁহার অধ্যাপনার জন্য উদগ্রীব হইয়া অপেক্ষা করি। আচার্য তখন তাঁহার গবেষণায় নিমগ্ন। কাজেই তাঁহার অবসর কম। তবু তাঁহার কাছে যে কয়দিন পড়িবার সৌভাগ্য হইয়াছিল, সে কয়দিনের কথা সারা জীবন স্মরণে থাকিবে।     (অংশ)

সূত্র: আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু/সম্পাদনা:

শেখর দত্ত ও রুশো তাহের (২০১৪)