ইটভাটায় পুড়ছে কৃষি জমির মাটি!

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:০৩

 ‘ধান উঠার পর সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বাজারে বেচা লাগে।

কষ্ট করিয়া ক্ষেত করলাম, এরপরে লছ (লোকসান)। ক্ষেত করিয়া কোনো লাভ নেই। মাজনরা (মহাজনরা) কম দামে ধান কিনিয়া স্টক করার পরে দাম বাড়ে। আমরা কৃষকর কিতা লাভ। জমির মাটি বেচলে ভালো টেকা (টাকা) পাওয়া যায়।’

নূরুল মোহাইমীন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা 

‘আসামি পাইজাম জাতের ধান ক্ষেত করিয়া মণপ্রতি ৫০০ টাকার উপরে খরচ অইছে। ধান উঠার পর সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বাজারে বেচা লাগে। কষ্ট করিয়া ক্ষেত করলাম, এরপরে লছ (লোকসান)। ক্ষেত করিয়া কোনো লাভ নেই। মাজনরা (মহাজনরা) কম দামে ধান কিনিয়া স্টক করার পরে দাম বাড়ে। আমরা কৃষকর কিতা লাভ। জমির মাটি বেচলে ভালো টেকা (টাকা) পাওয়া যায়। ক্ষেতর জমিনর একফুট পরিমাণ গভীর করিয়া মাটি বেচি লাইছি। এখন এই জমিত ক্ষেত না করিয়া পুকুর করাই লাভ।’ উপজেলার পতনঊষারের বৃন্দাবনপুর-বৈরাগীর চক গ্রামের কৃষক আবুল কালাম ক্ষোভে-দুঃখে এসব বলেন। 

সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার মুন্সীবাজার, বৃন্দাবনপুর, জালালিয়া গ্রাম এলাকায় ব্যাপকহারে জমির ঊর্বর মাটি কেটে ট্রাকযোগে ইটভাটাসমূহে নেয়া হচ্ছে। বর্তমান শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে কৃষি জমির উপরিতলের ঊর্বর মাটি কেটে ট্রাকযোগে ইটভাটাসমূহে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইট তৈরির কাজে তুলনামূলক কম দামে মাটি কিনে ভাটায় স্তূপীকৃত করা হচ্ছে। আর্থিক সুবিধা লাভে কৃষকরা জমির ঊর্বর মাটি বিক্রি করছেন। ফলে আবাদি এসব জমি হারাচ্ছে ঊর্বরতা। কৃষির উত্পাদনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ছে। পরিবেশেরও ক্ষতি বয়ে আনছে।

পতনঊষারের কৃষক জিয়াউল হক, কয়সর মিয়া, এনামুল হক বলেন, গরিব কৃষকদের বেলায় ধানের চারা রোপণের পর দোকান থেকে সার-কীটনাশক বাকিতে আনতে হয়। এরপর শ্রমিকের খরচসহ আনুষঙ্গিক অনেক খরচ লাগে। ফসল ওঠার পর দোকানে বাকির টাকা পরিশোধ করতে হয়। তখন বাধ্য হয়েই কমদামে ধান বিক্রি ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কৃষকরা আরও বলেন, এ সময়ে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। আবার মহাজনরা যখন ধান কিনে নেন তখন ধানের দাম বেড়ে যায়। লাভ হয় মহাজনী ব্যবসায়ীদের। তাই অনেক সময় ইচ্ছের বিরুদ্ধেও জমির ঊর্বর মাটি বিক্রি করতে হয়। উপজেলার মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপাল দেব বলেন, কৃষিজমির ঊর্বর মাটি খুবই জটিল বিষয়। ঊর্বর মাটির ছয় ইঞ্চি পরিমাণ গভীরতা চাষাবাদ উপযোগী। এই মাটি সরিয়ে ফেলা হলে পরের বছরসমূহে ভালো ফলন হয় না। প্রচুর গোবর-সার দিয়ে মাটি তৈরি করতে হয়। জমিতে প্রচুর পরিমাণ কৃত্রিম সার লাগে। পুনরায় মাটির ঊর্বরতা সৃষ্টি হতে কমপক্ষে দশ থেকে পনের বছর সময় লেগে যায়। এটি কৃষিজমির জন্য খুবই ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, কৃষিজমির উপরের ৬ ইঞ্চি পরিমাণ মাটি ঊর্বর। এই মাটি চলে গেলে উত্পাদনে প্রভাব পড়বে এবং পরিবেশেরও ক্ষতির সৃষ্টি হবে।  উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ নাহা বলেন, জমির ঊর্বর মাটি কেটে নিলে জমির জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটি মোটেই কাম্য নয়। তবে কৃষকের অভিযোগ থাকলেও ধানের মূল্য নির্ধারণ করে খাদ্য অধিদপ্তর। সেখানে কৃষিবিভাগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে মৌলভীবাজার জেলা কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তার মতে, কৃষিজমির ঊর্বর মাটি কোনোমতেই রোধ হচ্ছে না। এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করবে। তাছাড়া কৃষকরা ধান ধরে রাখতে না পারলে কম দামে বিক্রি করতে হয়। দাম বেশি পেতে হলে কিছুদিন ধান সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।