বাঙালি জাতির প্রাণের স্পন্দন বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে পা রাখছে। বীরের জাতি হিসেবে বাঙালিদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আর এসব ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। বলা হয়ে থাকে, যেখানে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম দেয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ নিয়ে কয়েক জন শিক্ষার্থীর অনুভূতি ও মতামত তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী— মো. জামিন আহমদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনুভূতির নাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মনে এলেই হূদয়ে এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পাসের প্রতিটি ঘাস আর বৃক্ষ আমার সেই অনুভূতির সাক্ষী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আবেগ কাজ করেছিল মূলত কলেজে পড়ার সময়। তাই স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করছি। যা হোক, প্রিয় শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠ আজ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে আবাসন সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। একদিকে যেমন সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নেই, তেমনি নেই গবেষণার পর্যাপ্ত বরাদ্দ। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু নিরাপত্তার পাশাপাশি সুস্থ রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। এ বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। প্রাণের এই বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাক দুর্বার গতিতে—সেই প্রত্যাশাই করি।
—মো. মোজাম্মেল হক (শিক্ষার্থী, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
বিদ্যমান সংকটগুলোর আশু সমাধান জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের সন্ধিক্ষণে এসে একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশের প্রাচীনতম এই বিদ্যাপীঠটির অর্জন ও প্রাপ্তির সংখ্যা অজস্র। বিশেষ করে বাঙালি জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বিকাশ ও পরিপূর্ণতা লাভের দিনগুলোতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সময়ের পরিক্রমায় সামর্থ্যের অতিরিক্ত প্রত্যাশার ভারও তৈরি হয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে। শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা শুভানুধ্যায়ী নয়, এখনো দেশের সিংহভাগ মানুষ দারুণ কিছুর আশা করে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশেষ করে মানসম্মত গবেষণা বৃদ্ধি, আবাসিক সমস্যার সমাধান, লাইব্রেরি বর্ধিতকরণ, ভর্তি ও অন্যান্য কাজে প্রশাসনিক জটিলতার অবসানসহ প্রভৃতি সমস্যার সমাধান হলে শতবর্ষী এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রা নতুন মাত্রা লাভ করবে বলে বিশ্বাস করি।
—ফারহান ইশরাক (ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনসিওরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
শতবর্ষেও চির উজ্জ্বল যার যৌবন
ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, গৌরব—সবকিছুর সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে, সেটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই যার নাম জড়িয়ে আছে নিজ দেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, জাতির ক্রান্তিকালে যখন সবাই দিশেহারা, তখন পথ দেখিয়েছে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন শতবর্ষী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সব জায়গায় অবদান ছিল এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। সুতরাং শতবর্ষে এসে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। যেমন— সুস্থ রাজনীতির চর্চা, আবাসিক সমস্যার সমাধান, হলগুলোতে খাবারের মানোন্নয়ন, অত্যাধুনিক গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা, টিএসসির ঐতিহ্য বজায় রেখে আধুনিকায়ন ও বহিরাগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।
—মো. তাসনিম হাসান আবির (শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির জীবনে যা কিছু বড় বড় অর্জন—সবকিছুতেই এই বিশ্ববিদ্যালয় নিবিড়ভাবে জড়িত। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠান বাঙালি জাতির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পালাবদলের কেন্দ্রবিন্দু। সুদীর্ঘ এই পথচলায় যেমন অনেক প্রাপ্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে অনেক বিসর্জন। এদেশের ইতিহাস বিনির্মাণে অবদান রাখলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল কাজ মৌলিক গবেষণায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এদিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। লাইব্রেরিতে আসন সংখ্যা ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অনুপাতে অতি নগণ্য। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের অধিকাংশ কার্যক্রম এখনো সেই সনাতন পদ্ধতিতেই চলে আসছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ভোগান্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
—শেখ মারজান (শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
শতজনমের ভালোবাসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯২১ সালে এক যুগসন্ধিক্ষণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আসন্ন ১ জুলাই দেশের সর্বপ্রাচীন এ বিশ্ববিদ্যালয় ১০০ বছরের মাইলফলক স্পর্শ করবে। বাঙালি জাতি শুধু নয়, এ ভূখণ্ডের সব মানুষের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম পরিণতি লাভ করার মিছিলে আলোকবর্তিকা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে উঠলেও বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও ক্রমবর্ধমান পরিসর এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেই ধারা অনেকটাই ব্যাহত করেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই শিক্ষালয়। শতবর্ষের মাইলফলক উদ্যাপনের মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবে—এ প্রত্যাশা শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্বিশেষে সবার।
—মো. ফেরদৌস আলম (শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
