দক্ষিণ ফরাসি উপকূলীয় শহর কান চলচ্চিত্রপ্রেমী কিংবা বোদ্ধাদের কাছে ‘মক্কা’। কেউ কেউ এই মহাযজ্ঞকে মনে করেন ‘সিনেমার অলিম্পিক’। কারও কারও কাছে এ যেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের তীর্থভূমি। তাই তামাম দুনিয়ার পেশাদার চলচ্চিত্রকর্মীদের নজর থাকে কানে।
সাগরপাড়ের শহরটিতে ভেসে বেড়ানো হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীব্যাপী। বাংলাদেশের পালেও সেই হাওয়া লাগে। তবে বাংলাদেশের জন্য কানের এবারের আসর অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রথমবার সম্মানজনক অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সেই গর্ব এনে দিয়েছে।
কানের ৭৪তম আসরের অফিসিয়াল সিলেকশনে কেবল আঁ সার্তে রিগা বিভাগেই আছে বাংলাদেশ। যদিও এবারের আয়োজনে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে থাকছে। সেগুলোর বেশিরভাগই কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে। বিভিন্ন দেশের প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক ও কলাকুশলীসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা জমায়েত হন এই শাখায়। তারা বিভিন্ন প্রকল্পের প্রযোজনা, পরিবেশনা ও নির্মাণ বিষয়ে মতবিনিময় করেন এবং ছবির নির্মাণ ও বিপণনে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন।

এবারের মার্শে দ্যু ফিল্মে ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার থেকে আমন্ত্রিত হয়েছে নুহাশ হুমায়ূনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুভিং বাংলাদেশ’। গত বছর গোয়া ফিল্ম বাজারে নির্বাচিত হয় এটি। মার্শে দ্যু ফিল্মের কো-প্রোডাকশন শাখা এবার বিভিন্ন দেশের বেশকিছু চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে কাজ করছে। সেই তালিকায় অন্যতম ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার।
.png)
মার্শে দ্যু ফিল্মের কো-প্রোডাকশন ডে’র জন্য ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার থেকে সাতটি প্রকল্প নির্বাচিত হয়েছে। নুহাশ হুমায়ূনের ‘মুভিং বাংলাদেশ’ এর মধ্যে একটি। ছবিটির বাংলাদেশি প্রযোজক আরিফুর রহমান ও বিজন ইমতিয়াজ। তারা ছবিটির সম্ভাবনা তুলে ধরবেন পেশাদার চলচ্চিত্রকর্মীদের সামনে।

মার্শে দ্যু ফিল্মের অন্যতম একটি প্রোগ্রামের নাম ‘কান ডকস’। এতে ‘ডকস-ইন-প্রোগ্রেস’ বিভাগে নির্বাচিত প্রামাণ্যচিত্র প্রকল্পগুলোর জন্য পোস্ট প্রোডাকশন অর্থায়নের দুয়ার খুলে যেতে পারে। ১৩ জুলাই ডক ডে’তে ছয়টি পুরস্কার দেওয়া হবে। ‘ডকস-ইন-প্রোগ্রেস’ ইন্টারন্যাশন্যাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় শোকেস সাউথ এশিয়ায় নির্বাচিত চারটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকল্পের মধ্যে দুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে তাহরিমা খান পরিচালিত ‘মুন্নি’র প্রযোজক আবু শাহেদ ইমন। এছাড়া ‘থার্টিন ডেস্টিনেশনস অব অ্যা ট্রাভেলার’ যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের মোখলেসুর রহমান তালুকদার লেনিন ও কলকাতার সৌম্য মুখোপাধ্যায়। এটি পরিচালনা করছেন পার্থ দাস।

শোকেস সাউথ এশিয়ায় নির্বাচিত প্রকল্প দুটির ১০ মিনিট করে রাফ-কাট উপস্থাপনা থাকবে আগামী ৭ জুলাই অনলাইনে এবং ১০ জুলাই সরাসরি। এতে অংশ নেবেন ইন্টারন্যাশন্যাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের সভাপতি সামিয়া জামান। এছাড়া ট্রেনিং প্রোগ্রামস, ওয়ার্কশপ ও ল্যাবসে অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত হবেন ঢাকা ডক ল্যাবের পরিচালক তারেক আহমেদ।

গুপি বাঘা প্রোডাকশনসের আরিফুর রহমান আরেকটি প্রকল্পের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবারের কানে। ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউটের লা ফেব্রিক সিনেমায় নির্বাচিত বিভিন্ন দেশের সম্ভাবনাময় মোট ১০টি ছবির চিত্রনাট্যের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ, ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনা ‘একা’। এর ইংরেজি নাম ‘সলো’। এটি বাংলাদেশ থেকে প্রযোজনা করছেন আরিফুর রহমান। ছবিটির অন্য দুই প্রযোজক ফ্রান্সের ডিডব্লিউ প্রোডাকশনসের ডমিনিক ওয়েলিনস্কি এবং কলকাতার পরিচালক সুমন সেন।

কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে অংশ নিতে আসা বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র পরিবেশক ও এজেন্টদের সঙ্গে উদীয়মান তরুণ নির্মাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে ফ্রান্স সরকারের ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট রাখে ‘ত্যু লে সিনেমাস দ্যু মন্দ’ (অল দ্য সিনেমাস অব দ্য ওয়ার্ল্ড) প্যাভিলিয়ন। এখানেই থাকে ‘লা ফেব্রিক সিনেমা’র (দ্য সিনেমা ফ্যাক্টরি) আয়োজন। মর্যাদাসম্পন্ন কান উৎসব স্বীকৃত প্যারালাল বিভাগগুলোর মধ্যে এটি একটি।

বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য ভিতটা গড়ে দিয়েছিলেন প্রয়াত তারেক মাসুদ। তিনিই প্রথম স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, মেধা আর পরিশ্রমের সম্মিলন ঘটলে স্বীকৃতি ধরা দেবে হাতের মুঠোয়। এতদিন কানে বাংলাদেশের সবেধন নীলমণি ছিলো তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। উৎসবটির প্যারালাল বিভাগ ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে ২০০২ সালে নির্বাচিত হয় ছবিটি। শুধু তাই নয়, ২০০২ সালে চলচ্চিত্র সমালোচকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের ফিপরেস্কি পুরস্কার জেতে ‘মাটির ময়না’। কানে বাংলাদেশের অর্জন বলতে এটুকুই ছিলো।

কান উৎসব চলাকালে ১৯৬৯ সালে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট চালু করে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। প্যারালাল বিভাগটিতে নির্বাচিত ছবিগুলোকে কানের আয়োজকরা স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। তবে তা অফিসিয়াল সিলেকশন নয়। সেই হিসেবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের হাত ধরে কানসৈকতে মর্যাদার সঙ্গে উড়তে যাচ্ছে লাল-সবুজ পতাকা। তারেক মাসুদের পর কান জয় করতে যাচ্ছেন এই তরুণ।

আগামী ৬ জুলাই ৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠবে। এতে অংশ নিতে অফিসিয়াল আমন্ত্রণ পেয়ে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সংশ্লিষ্ট সাতজন প্যারিসে কোয়ারেন্টিন করছেন। ৫ জুলাই কানে পা রাখবেন তারা। এরপর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ ও আজমেরী হক বাঁধনের দিকে আলো পড়বে সারা দুনিয়ার! আঁ সার্তে রিগা বিভাগে তাদের ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাম উঠে যাবে সম্মানজনক কাতারে। কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার!
ইত্তেফাক/জেএইচ
