ভেনিজুয়েলা নিয়ে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৯

ভেনিজুয়েলার বর্তমান সংকট এক সময়কার শীতল যুদ্ধের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাশিয়া ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন স্বঘোষিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট’ হুয়ান গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সাম্প্রতিক যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে মনে হয় গুপ্তচর থ্রিলার। গুঞ্জন উঠেছে এক পক্ষ থেকে মাদুরোকে রক্ষার চেষ্টা এবং অন্য পক্ষ থেকে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। আর গুয়াইদোও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেননি।

মাদুরো ফিদেল কাস্ত্রো!: নিকোলাস মাদুরো নিজেকে ফিদেল কাস্ত্রো ভাবেন। রুশ বার্তা সংস্থা আরআইএকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে মাদুরো বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্দেহ নেই যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে হত্যা করতে কলম্বিয়া সরকার এবং মাফিয়াদের নির্দেশ দিয়েছেন। মাদুরোর ‘নাটক’র এ এপিসোড মনে করিয়ে দেয় কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ব্যর্থতার কথা। কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট নিয়ে এ সব এপিসোড তৈরি হয়েছিল।

সিরিয়া না ভিয়েতনাম?: গত বছরের শেষ দিকে রাশিয়ান বোম্বারস বিমান ভেনিজুয়েলায় গেছে যেগুলো পরমাণু অস্ত্র সরবরাহ করতেও সক্ষম। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে খেলতে চান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এটা ভিয়েতনামও হতে পারে, আবার সিরিয়াও হতে পারে যেখানে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। মাদুরোর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং তার ভাষা আমেরিকার নতুন উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। এটা একটা বড় প্রতিবাদ। মাদুরো ইতোমধ্যে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরেকটি ভিয়েতনাম চান। ওই যুদ্ধ ছিল আমেরিকার দীর্ঘতম দ্বিতীয় যুদ্ধ। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা এবং ৪০ লাখ ভিয়েতনামি মারা গিয়েছিল। লাতিন আমেরিকায় বর্তমান শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। তখন ছিল আদর্শগত লড়াই। কিন্তু এখন রাশিয়া ভেনিজুয়েলায় মার্কসবাদ বিস্তৃতির জন্য কাজ করছে না, বরং ব্যবসা বাড়াতেই মাদুরোকে সমর্থন দিচ্ছেন রাশিয়ার পুতিন।

রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি রজনেফট মাদুরো সরকারের সবচে বড় সমর্থক। রাশিয়া এবং রজনেফট ভেনিজুয়েলাকে কোটি কোটি ডলার সহায়তা এবং ঋণ দিয়ে থাকে। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এ সব ঋণ বহন করে। গত বছর এক গবেষণায় বিশ্লেষক জুলিয়া গুরগানুস বলেন, নিজেদের আর্থিক নিশ্চয়তা বাড়াতে ভবিষ্যত্ তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে পিডিভিএসএ বিক্রি পূর্ব অর্থের জন্য রজনেফট এর ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে রজনেফট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কেবল আর্থিক দিকই মস্কোর প্রধান লক্ষ্য নয়। সম্প্রতি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভেনিজুয়েলা সংকটকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব বলে উল্লেখ করছে। টিভি চ্যানেলটি গুয়াইদোর সংগ্রামকে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ‘গণতন্ত্রপন্থি বিদ্রোহ’ বলে উল্লেখ করছে। চ্যানেলটি আবার ‘আরব বসন্ত’ বলেও উল্লেখ করছে, যে বসন্তে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিকে উত্খাত করা হয়েছিল।

প্রভাব বাড়াচ্ছে রাশিয়া: রাশিয়া নিয়মিতই অভিযোগ করে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে বিভিন্ন সময় তার বিরোধী শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করে। যুক্তরাষ্ট্র অভ্যুত্থানকে বিভিন্ন রং এ আখ্যায়িত করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের আমলের কথা ধরা যাক। কার্নেগী এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রিউ ওয়েইস জানান, ওই সময় ক্রেমলিন বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগ করতো। কারণ রাশিয়ার ক্রেমলিনে এমন লোকের অভাব নেই যারা মার্কিন ষড়যন্ত্রের কথা বলতে পারেন। তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষের লোককে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্র করে। ওয়েইস মাদুরোকে পুতিনের সমর্থনের আরেকটি কারণ উল্লেখ করে থাকেন। তাহলো বিশ্বে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার। এটা বড় ধরনের হুমকি। লাতিন আমেরিকায় রাশিয়া আগের চেয়ে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। যদিও ভেনিজুয়েলা রাশিয়া থেকে বহু দূরের দেশ। সেখানে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিও নেই। কিন্তু তাই বলে রাশিয়ার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেমে থাকবে না। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী মাদুরোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। মাদুরো কিন্তু সেটি স্বীকার না করলেও নাকচ করেননি।

মাদুরোর ওপর চাপ বাড়ছে: মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন মাদুরো ও তার উপদেষ্টাদের নির্বাসনে চলে যাবার ডাক দিয়েছেন। ইইউ পার্লামেন্ট গুইয়াদোকে স্বীকৃতি দিয়ে মাদুরোর উপর চাপ বাড়িয়েছে। এর আগে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন মাদুরোর উদ্দেশ্যে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘোষণার ডাক দিয়েছিল। সেই আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ হয়েছে শনিবার। মাদুরো নিজেও বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে তার আপত্তি না থাকলেও নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আরো জোরালো হচ্ছে। তবে মাদুরো ও গুয়াইদোর কেউই নিজের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত নন।