কো নো দেশের উন্নয়নের জন্য নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এ সময়কাল অবধি নারী উন্নয়নের ধারাটি যদি লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের নারীরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। তবে যতটা প্রত্যাশিত ছিল, ততটা ঘটেনি।
না ঘটার প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য। নারী উন্নয়নের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হচ্ছে নারী শিক্ষা ও নারীর প্রশিক্ষণ। শুধু শিক্ষা নয়, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের নারীরা আরেকটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে, আর সেটা হলো স্বাস্থ্য। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে নারী উন্নয়নের পথে আরেকটি বড় বাধা। পুরুষতন্ত্র উগ্র হয়ে উঠলেই এ সহিংসা দেখা দেয়। বাংলাদেশের পশ্চাত্পদ পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। নারীরা যেমন ঘরে নিরাপদ নয় তেমনি বাইরেও নয়। কারণ নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধিসহ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে উত্ত্যক্তকরণ। এই নিগ্রহের ফলে সমাজে নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
নারী উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তারা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। রাজনীতি, খেলাধুলা, কৃষি, শিক্ষা, করপোরেশন, শোবিজ সবখানে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। খেলাধুলার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই। ২০০৬ সালে প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় নারী দল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের সঙ্গে খেলা হয়। ২০১৪-২০১৭ সালে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল দল সাফ অনূর্ধ্ব ১৫ চ্যাম্পিয়ন শিপে চ্যাম্পিয়ন হয়। এর আগে ভারতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল রানারআপ হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার জনবলের ২৮ হাজার নারী। তৃণমূল পর্যায়ে ২৩ হাজার পরিবার পরিকল্পনা সহকারী এবং সাড়ে ৪ হাজার পরিদর্শিকা নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিতের জন্য কাজ করছেন। আইএলও (ILO) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট এক কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭৪ শতাংশ অর্থাত্ প্রায় ৯২ লাখ নারীই কৃষি কাজ, মত্স্য চাষ ও সামাজিক বনায়নের সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২২ জন নারী সাংসদ রয়েছেন। নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি উপজেলায় একজন করে নারী ভাইস চেয়ারম্যান এবং সংরক্ষিত আসনে তিনজন করে সদস্য রয়েছেন। আমাদের দেশের নারীরা বাসা-বাড়িতে রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালনসহ গৃহস্থালির কাজকর্ম করেন যার স্বীকৃতি জিডিপিতে নেই। এই শ্রমের আর্থিক মূল্যমানও নির্ধারণ করা হয় না। নারীরা দৈনিক গড়ে ১৬ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন, যার জন্য কোনো মজুরি তারা পান না। তারা সব মিলিয়ে প্রতিবছর ৭৭ কোটি ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। এতে এ কাজের মোট অর্থমূল্য হয় ছয় হাজার ৯৮১ কোটি থেকে নয় হাজার ১০৩ কোটি ডলার। এই অর্থ যদি বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) যুক্ত করা হতো, তাহলে এর আকার দ্বিগুণেরও বেশি হতো। বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা রয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী। সুতরাং বাংলাদেশ নারীর উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে তা বলতে কোনো সন্দেহ নেই।
মেয়েদের মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাদের মেধা, প্রতিভা ও কর্মক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বীকৃতি দিতে হবে সব ভালো কাজের। কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্য ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে সমানতালে। তাছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ ও সকলের সচেতনতার মাধ্যমে এ বৈষম্য থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অনেকটা সম্ভব।
n লেখক:শিক্ষার্থী, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর।
