শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড ও শিক্ষকেরা হলেন এই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর। যদি প্রশ্ন করা হয় একটি আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা বোধ সম্পন্ন জাতি তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি? বোধ হয় সবচেয়ে সঠিক জবাব হওয়া উচিত নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা।
পরিবার থেকে বের হয়ে এসে একজন শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্য দিয়ে তার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে মা-বাবা যেমন তার প্রথম শিক্ষা, এই পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা হন তার দ্বিতীয় মাতা-পিতা। প্রথম পর্যায়ের চার/পাঁচ বছরে পরিবার থেকে সে যা শিখে আসে, বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার এক দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিদ্যালয়ে একটি শিশু শৈশবের দশটি বছর পার করে দিয়ে যৌবনে পা রাখে। অপরিণত বয়স থেকে পরিণত বয়সের দিকে এগিয়ে যায়। এগিয়ে যায় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে। দ্বিতীয় পর্যায় সেই পর্যায়- যখন একটি শিশু জীবনের অভিজ্ঞতার পৃষ্ঠা থেকে জ্ঞান আহরণের সঙ্গে সঙ্গে অথবা তার পরিবর্তে জ্ঞান লাভের জন্য অভিজ্ঞতাচ্যুত হয় এবং তা পাওয়ার জন্য বইপত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হাত ধরে সে বইয়ের জগতে প্রবেশ করে। বড় কঠিন এই দ্বিতীয় পর্যায়। একজন শিক্ষার্থীর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সময় এটা। সেই জন্য এই পর্বে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী কর্মজীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার ভিত্তি রচিত হয়ে যায় এই পর্বে। চীনের প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন-‘শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উত্স। তিনি হবেন একজন আদর্শ শাসক’।
শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার। শিক্ষক হলো তার সুনিপুণ কারিগর। শিক্ষা ছাড়া আলোকিত মানুষ সৃষ্টি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন শিক্ষকের কিছু কাজ ও দায়বদ্ধতা আছে। এ কাজ ও দায়বদ্ধতা সহকর্মীদের কাছে, সমাজের কাছে, দেশ ও জাতির কাছে, আগামী প্রজন্মের কাছে। একজন সফল মানুষের পেছনে শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। মানবিক বিপর্যয় বা বৈশ্বিক, অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত হয়েও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনির্মাণে শিক্ষকরা অবিরাম ভূমিকা রেখে চলেছেন। শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক। শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না, তিনি মানুষ গড়ার কারিগরও। পিতা-মাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী লুনাচারস্কি বলেছিলেন, শিক্ষক হলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি নতুন প্রজন্মের কাছে যুগ-যুগান্তরে সঞ্চিত যাবতীয় মূল্যবান সাফল্য হস্তান্তরিত করবেন, কিন্তু কুসংস্কার, দোষ ও অশুভকে ওদের হাতে তুলে দেবেন না। এটাই হলো শিক্ষকদের গুরুত্বের মাপকাঠি। মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু তাদের দিয়েই আমরা সুস্থ কুঁড়িগুলোকে লালন করতে পারি। আমেরিকার ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস শিক্ষকের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেন, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এ বিষয়ে বলেছেন, শিক্ষক সমাজ হচ্ছেন প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। তাই তো শিক্ষকদের বলা হয় ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ তথা সমাজ নির্মাণের স্থপতি। সমাজের সার্বিক অগ্রগমনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ভালো শিক্ষক-এর যে সব গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়- অবশ্যই ছাত্র-ছাত্রীদের মন বুঝতে হবে। নিজের শিখবার আগ্রহ থাকতে হবে। মাদকমুক্ত, সমাজ গঠনে শিক্ষকদের অনেক ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকরাই পারেন একটি সমাজকে মাদকমুক্ত করতে। এটি শুধু আইন প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশে এজন্য শিক্ষার হার শতকরা ৭২ ভাগে দাঁড়িয়েছে। আজকের তরুণ শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলে জাতি গঠনে কাজে লাগাতে হবে।
সরকার শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে তাদের সর্বাধিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। কারণ যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। তাই কোনো জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকার শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধিসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন সত্ মানুষ, শিক্ষিত মানুষ ও জ্ঞানী মানুষের। সোনার বাংলা বিনির্মাণ সময়ের দাবি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। শিক্ষকমণ্ডলী যারা আগামীর জন্য মানুষ সৃষ্টি করেন তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। একজন শিক্ষকই পারেন একজন সুন্দর ও জ্ঞানী মানুষ তৈরি করতে। মানুষ যদি জ্ঞানী না হয় এবং জ্ঞান সমৃদ্ধ না হয় তাহলে সমাজের কোনো কাজে আসতে পারে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
