দৈনিক আজাদ, ২৯ জুলাই ১৯৪৭

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২৭

 

...পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে সে বিষয়ে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ বিবেচনা করিতেছেন। ... উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাত্গমনই হইবে।

আমরা ইংরেজকে পরিত্যাগ করিতে পারি, কিন্তু ইংরেজিকে ত্যাগ করিতে পারি না। ইহা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং আধুনিক চিন্তাধারা ও বিজ্ঞানের বাহন। পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান এই দুইটি ডোমিনিয়নকেই প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করিতে হইলে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা উচিত। ... যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভের জন্য ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিল, কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর তাহারা ইংরেজি ভাষাকে পরিত্যাগ করেন নাই। ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোন প্রদেশের অধিবাসীরই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীর মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন- পশতু, বেলুচী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী এবং বাংলা। কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই মাতৃভাষারূপে চালু নয়।

উপরিউক্ত ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা ভাষার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করিয়াছে। কত অধিকসংখ্যক লোকে একটি ভাষা বলে, এই অনুযায়ী বাংলা ভাষা বিশ্বভাষার মধ্যে সপ্তম স্থান অধিকার করিয়াছে। যদি বিদেশি ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করিবার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য। ভারতের সর্বত্রই অনেকে মোটামুটিভাবে উর্দু ভাষা বুঝিতে পারে। এমনকি আরব, ইরান ও আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসীগণও সহজেই অনুসরণ করিতে পারিবে। এই দিক দিয়া উর্দুর হিন্দি অপেক্ষা আন্তর্জাতিক ভাষারূপে পরিগণিত হইবার সুবিধা আছে। কিন্তু উর্দু অপেক্ষা ইংরেজির দাবি অগ্রগণ্য। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে যে সুবিধা পাওয়া যাইবে, উর্দু ভাষা সে তুলনায় নগণ্য।

... পাকিস্তান ডোমিনিয়ন অথবা অন্য যে কোনো ডোমিনিয়নের প্রদেশসমূহে বিচারালয়, আইন পরিষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভাষা ব্যবহূত হইবে, তাহার সহিত রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে একত্রে জড়িত করিয়া দেখা উচিত নয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষ সকলের সাহিত্যিক ভাষা। সুতরাং পাকিস্তানের ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা শ্রেষ্ঠ। ভারতে মুসলিম যুগের পূর্বেও পুরাতন বাংলা ভাষা ছিল। ইহার জন্য বাংলা বৌদ্ধ সমাজের নিকট ঋণী। সেইরূপ পাঠান আমলে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য মুসলমান আমীর ও সুলতানদের সহায়তায় গড়িয়া ওঠে এবং সমৃদ্ধশালী হয়। ... ব্রিটিশ আমলেও বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের দান নগণ্য নয়, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইয়াছে। বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ...

সংগ্রহ ও গ্রন্থনা :দীপংকর চন্দ