বিথঙ্গলের বিস্ময়

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২১, ২১:০০

জাকারিয়া মন্ডল

সৌরবিদ্যুতে আলোকিত বাজারের পেছনেই বিথঙ্গল আখড়া। অতিকায় এক মুঘল কাঠামো। আয়তাকার। পুরো কমপ্লেক্সটা কয়েকভাগে বিভক্ত বলে কয়েকটা পৃথক চত্বর তৈরি হয়েছে ভেতরে। প্রতি চত্বরের পাড় জুড়ে সারি সারি ঘর। মাঝের চত্বরের মধ্যিখানে চালা আকৃতির মন্দির। ভেতরে শ্বেত পাথরের চৌকি, ২৫ মণ ওজনের। পাশে পিতলের সিংহাসন, নকশাখচিত প্রাচীন রথ, রুপার পাখি, সোনার মুকুট

নদীর নাম জিজ্ঞাসা করতেই কিশোর মাঝি অবাক। খানিক ভেবে নিয়ে অমায়িক হাসল। বলল, ‘নদীর  নাম তো নদীওই।’

হাওড়ের এই কিশোরের কাছে সব নদীই নদী। কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট। বিস্তৃত জলাশয় ওদের কাছে বিল, আর খালগুলো নদী।

গুগল মানচিত্র বলছে, এ নদীর নাম সাঁতাই। স্থানীয়রা কোথাও কোথাও এটিকে সরস্বতী বলে ডাকে। তার বুকে এখন চুমু খেতে নামছে সূর্যটা। নৌকার নাক বরাবর মাঝ নদীতে ঝুলে বেলা শেষের বার্তা দিচ্ছে। হাসছে, খেলছে ঢেউয়ের তালে।

রত্না ঘাট পড়ে রইল পেছনে, ডানে বানিয়াচঙ। বাঁয়ের নরম পলিতে গরুর বদলে জোয়াল টানছে মানুষ। দু দিকে দুজন হাতের কোলে জোয়াল নিয়ে সামনে বাড়ছে। পেছনটা চেপে ধরে মাটির সঙ্গে দাবিয়ে রেখেছে একজন। তাতে চষা হয়ে যাচ্ছে জমি। এ যেন ঠিক কোনো সিনেমার গল্প!

নৌকার সামনের দিকটায় চালের বস্তা, উপরটা কলার কাঁদিতে বোঝাই। তারওপর যাত্রীও উঠেছে ঢের। ইঞ্জিনচলিত নৌকাটা তাই পূর্ণ গতি পেল না।

একসময় পৈলারকান্দির দিকে এগিয়ে যাওয়া জলধারা ছেড়ে নৌকা ধরল বিথঙ্গলের জলরাস্তা। গভীরতা পড়ে গেল হুট করে। ইঞ্জিন বন্ধ করে খানিক এগুতে হলো দাঁড় ঠেলে। তারপর ফের শ্লথ গতিতে ছুটল। একটা বাজারের কাছে এসে আর পারা গেল না। নামতে হলো সবাইকে। তারপর নামানো হলো বস্তা আর কলার কাঁদি।

একপাশে বাজার। বিপরীতে খালের ওপারে একটা হাঁসের খামার, তার ওপারে কবরস্থান। ডানদিকে একটা স্কুল। নিচেরটা ফাঁকা। এখন হেঁটে গিয়ে ওঠা যায় স্কুলটায়। কিন্তু বর্ষাকালে নৌকা থেকেই পা তুলতে হবে স্কুলের সিঁড়িতে। আর এই বাজারটা তখন হবে থই থই জলঘেরা দ্বীপ।

এরই মধ্যে ‘মারো ঠেলা, হেইয়ো’ বলে যাত্রীরা ঠেলেঠুলে ওজন কমানো নৌকাটাকে অগভীর জায়গাটা পার করালো। তারপর কমানো ওজন ফের চাপানো হলো নৌকায়। চালু হলো ইঞ্জিন। কিন্তু ফের থামতে হলো খানিক এগিয়েই। এবার মাছ ধরার আয়োজনে পুরো পথটাই বন্ধ। খুব বেশি নৌকা চলে না এখন। তাই অমন বাঁশের চাটাইয়ে পুরো পথটা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঝে একটা জোড়া আছে। ওটা উঠিয়ে নৌকা ওপারে নিয়ে ফের জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হলো।

নদীর পাড়ে ফুটবল খেলছে শিশু-কিশোররা। জমির আইল ধরে লম্বা এক সারিতে বাড়ি ফিরছে হাঁসের পাল। নদীর বুকে আঁধার জমতে শুরু করল। দু পাড়ের গ্রামগুলো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আঁধারে। এমন আঁধার চিরেই চেনাপথে নৌকা ছুটল বিথঙ্গলের দিকে। সামনে আরো একটা মাছধরার বেড়া। যাত্রীরা এবার নেমে হাঁটা দিল।

ধবধবে পলিমাটির পথ। দু পাশে প্রশস্ত সবুজ পাড়। ঘাসে ছাওয়া। এই ঘাস গোখাদ্য। এমন রাস্তা গোপাঠ নামে পরিচিত হাওড়াঞ্চলে। অনেক বটগাছের ঘেরে দাঁড়িয়ে থাকা কবির গোঁসাই-এর পরিত্যক্ত আখড়ার পাশ দিয়ে এগিয়ে বিথঙ্গল ঢোকার মুখে বাঁশের সাঁকো। নিচে স্রোতহীন নদীতে বাঁশ জাগ দিয়ে রাখা। বর্ষায় সাগরের মতো ঢেউ খেলে এখানটায়।

ভর সন্ধ্যায় বিথঙ্গল বাজার গমগম করছে। হাওড়ের আর সব বাজার-জনপদের মতো এখানেও জায়গা কম। অল্প স্থানে অনেক মানুষের ভিড়। দোকানগুলোতে অল্প কিছু সবজির পসরা। এদের ধানের অভাব কম। কিন্তু শীতকালে সমতলে যখন সবজির মৌসুম, হাওড়ের জমি তখন থাকে পানির নিচে। জমির অভাবে তাই সবজি ফলাতে পারে না হাওড়ের মানুষ। যখন জমি জাগে, তখন আসে ধান বোনার সময়। তাই অগ্রহায়ণ নয়, এখানে নবান্ন আসে বৈশাখে। কিন্তু এখন কার্তিক মাস। সবে ফসল বোনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

সৌরবিদ্যুতে আলোকিত বাজারের পেছনেই বিথঙ্গল আখড়া। অতিকায় এক মুঘল কাঠামো। আয়তাকার। পুরো কমপ্লেক্সটা কয়েকভাগে বিভক্ত বলে কয়েকটা পৃথক চত্বর তৈরি হয়েছে ভেতরে। প্রতি চত্বরের পাড় জুড়ে সারি সারি ঘর। মাঝের চত্বরের মধ্যিখানে চালা আকৃতির মন্দির। ভেতরে শ্বেত পাথরের চৌকি, ২৫ মণ ওজনের। পাশে পিতলের সিংহাসন, নকশাখচিত প্রাচীন রথ, রুপার পাখি, সোনার মুকুট। নাটমন্দিরের সামনে সামিয়ানা টানিয়ে কার্তিক সংক্রান্তির আসর। মৃদঙ্গ, করতালে সারারাত জেগে রইল বিথঙ্গল।  

প্রতি ঘরেই খিলানের ওপরে দরোজা, ভল্টেড ছাদ। ফুল-পাতার নকশা। বারান্দা জুড়ে কারুকাজখচিত বিমের সারি। মাটির অতিকায় মটকাগুলোর বয়স কত কে জানে!

সুবিস্তৃত ছাদ যেন রাইস মিলের বিস্তৃত চাতাল। রোদে ফসল শুকানোর জন্য সদা প্রস্তুত। জল গড়ানোর জন্য একটা দিক কিঞ্চিত্ ঢালু। একপাশে ছাদটা কয়েক ফুট নিচে নামিয়ে দিয়ে চৌবাচ্চার মতো জায়গায় হরেক ফুলের গাছ। আখড়ার দু পাশে দুটো বিশাল পুকুর। একটা স্নানের। আরেকটা পূজার পানির।

এই আখড়া জগমোহিনী সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র। এই সম্প্রদায় সম্পর্কে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ গ্রন্থে জেমস ওয়াইজ (১৮৮৩) লিখেছেন, ‘এই গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা জগেমাহন।’ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশে (১৯১০) অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি লিখেছেন, ‘ইহা একটি নতুন ধর্মমত।’ ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় খণ্ডে (২০১৭) অক্ষয় কুমার দত্ত বলছেন, ‘জগমোহন গোঁসাই এই ধর্মের সূত্রপাত করে যান বলে এই সম্প্রদায়ের নাম জগন্মোহিনী। এরা নির্গুণ উপাসক। কোনো সাকার দেবতার অর্চনা করে না। গুরুকেই সাক্ষাত্ পরমেশ্বর বলে অঙ্গীকার করে।’ বঙ্গমানস ও অন্যান্য শীর্ষক প্রবন্ধে (২০১০) ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছেন, ‘হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই বহু শিষ্য ছিলো জগমোহনের। সব শিষ্যের শিরোমণি ছিলেন রামকৃষ্ণ গোঁসাই।’

এই বিথঙ্গল আখড়াতেই রামকৃষ্ণ গোস্বামীর সমাধি। ত্রিপুরা রাজ উত্সব রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে এই আখড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন আরো অনেক আখড়া আছে এদের। বঙ্গীয় স্থাপত্যচর্চায় জগমোহিনী সম্প্রদায়ই সবচে এগিয়ে।

জগমোহিনীদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। ধর্ম সংগীতই প্রধান অবলম্বন। সেই সংগীতের নাম নির্বাণ সংগীত। এই সংগীতের একটি পদ এরকম—

‘পূর্বে না ছিল কেহ, না থাকিবে পাছে।
মিছা মায়া সংসারে ভ্রমেতে ভুলিয়া আছে।’

 

পুকুরপাড়ে বিথঙ্গল আখড়া, ছবি : আবু বকর সিদ্দিক