রায়হান সিদ্দিক
সুন্দরবনের মোহনায় রূপসা নদী শেষ হয়েছে। মিঠেপানির কাঁকড়াগুলো নদীর প্রায় মোহনায় এসে জড়ো হয়েছে। এ বছর ওদের খাদ্যের খুবই অভাব। ওরা সাধারণত সবকিছুই খায়। তবে বেশি পছন্দ করে ছোট মাছ, শামুক, ঝিনুক, জলজ কীট এগুলো। মোহনার কাছাকাছি নদীর পাড় ঘেঁষে পানির নিচে ওরা বাস করে। বাসস্থান মানে মাটির গর্ত। সমুদ্রে বড় বড় প্রাণী আর তীরে বনের হরিণ, শিয়াল, বাঘের হাত থেকে বাঁচার জন্যই গর্তে বাস করা। যখনই আক্রমণের ভয় থাকে, সুড়সুড় করে গর্তে ঢুকে যায়।
মিঠেপানির কাঁকড়াদের রাজা বলল, ‘আমাদের খাদ্য নেই। খাদ্যের জন্য সমুদ্রের একেবারে কাছাকাছি যেতে হবে।’
‘কিন্তু সেখানে তো লোনাপানির কাঁকড়ারা আছে। ওরা আমাদের তাড়িয়ে দেবে।’ এক বৃদ্ধ কাঁকড়া বলে উঠল।
‘আমরা ওদের কাছে খাবার চাইব। বলব, আমাদের খাবারের বড় অভাব। আমাদের যেতেই হবে।’
রাজার নির্দেশ। অতএব মিঠেপানির সব কাঁকড়া নদী পেরিয়ে ভোরবেলা সমুদ্রের ধারের বনাঞ্চলে এসে পৌঁছাল। লোনাপানির কাঁকড়া মানে সামুদ্রিক কাঁকড়া। এরা মিঠেপানির কাঁকড়ার চেয়ে আকারে বড় হয়। এরা সাধারণত সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে বেশি থাকে, যেখানে প্রতিদিন সমুদ্রের জোয়ারে উপকূলের বনাঞ্চল প্লাবিত হয় আবার ভাটায় পানি সরে যায়। এই বনাঞ্চলকেই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বলে। এটি সামুদ্রিক কাঁকড়াদের প্রিয় স্থান। এখান থেকে ওরা খাবার সংগ্রহ করতে পারে।
নদীর কাঁকড়ারা ভেবেছিল সমুদ্রের বন্ধুরা ওদের সাদরে গ্রহণ করবে, খাবার খেতে দেবে। কিন্তু সামুদ্রিক কাঁকড়ারা ওদের দেখেই দলবেঁধে আক্রমণ চালাল। নদীর কাঁকড়ারা ক্ষুধার্ত ও দুর্বল। তাছাড়া আকারেও ছোট। আক্রমণে কয়েকটি কাঁকড়া তো মরেই গেল। আহত হলো অনেক। বড় দুঃখ নিয়ে মিঠেপানির কাঁকড়াদের রাজা বাকিদের নিয়ে কোনোরকমে ফিরে এল নদীতে।
সময়টা ছিল বৈশাখ মাস। ইংরেজি এপ্রিল মাসের শেষ দিক। প্রকৃতি প্রচণ্ড রুক্ষ। মিঠেপানির কাঁকড়ারা ফিরে আসার পরদিন থেকেই সমুদ্র উত্তাল হতে শুরু করল। দুই দিন প্রচণ্ড মাতামাতি, তারপর দূরের সমুদ্র থেকে ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে সবকিছু যেন উপকূলে ঠেলে দিল। বনের ধার ঘেঁষে রূপসার মোহনায় প্রচুর শামুক, ছোট মাছ, সামুদ্রিক পোকা এসে আছড়ে পড়ল।
সমুদ্রের কাঁকড়াদের দুই দিন খাওয়া হয়নি, ঝড়ের সময় লুকিয়ে ছিল গর্তে। ক্ষুধায় দিশেহারা হয়ে ওরা দলে দলে জড়ো হলো মোহনায়, রূপসার পাড়ে।
মিঠেপানির কাঁকড়ারা অস্থির হয়ে উঠল। কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইল, কেউ পালাতে চাইল। রাজা বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। বৃদ্ধ কাঁকড়া রাজাকে পরামর্শ দিল সবাই মিলে চুপ করে গর্তে লুকিয়ে থাকতে।
সমুদ্রের কাঁকড়ারা এল। গোগ্রাসে খাবার গিলতে লাগল। শামুক, মাছ আর ঝিনুক খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিল সবাই। নড়ার শক্তি নেই।
নদীর পাড় ঘেঁষে বন থেকে একে একে বের হলো শিয়াল, হরিণ, বানর। কাঁকড়া ওদের প্রিয় খাদ্য। মহা ধুমধামে ভোজে মত্ত হলো সুন্দরবনের এই বাসিন্দারা। এল বাঘেরা। কাঁকড়া বাঘেরও প্রিয় খাবার। ফলে কী হলো? নড়তে-চড়তে না পেরে লোনাপানির প্রায় সব কাঁকড়াই পশু-প্রাণীদের পেটে গেল। মাত্র কয়েকটি কেবল প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল গভীর সমুদ্রে।
সবকিছু যখন শান্ত হলো, মিঠেপানির কাঁকড়ারা তখন গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এল। এরই মধ্যে তারা টের পেয়েছে কী হয়েছে। সবাই মিলে রাজাকে ঘিরে আনন্দে নাচানাচি শুরু করল।
আর রাজা?
রাজা বৃদ্ধ কাঁকড়াটির হাত ধরে বসে বসে ওদের ফুর্তি উপভোগ করতে লাগল।
