বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই একুশের বই-মেলাকে বলে থাকেন ‘প্রাণের মেলা’। সঙ্গত এই বিশেষণ, কারণ প্রাণে প্রাণে এমন যোগ পৃথিবীর খুব কম মেলাতেই সুলভ। বইমেলা কোনো অনড় জায়গায় আটকে নেই— প্রাণের ধর্মও তো তাই; সতত প্রবাহিনী। এক সময় ভাবা যায়নি যে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে মেলাটি বিস্তৃত হবে। আর এখন তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়া ভাবাই যায় না একুশের বইমেলা। মেলার পরিসরে যেমন তেমনি বিন্যাসেও এসেছে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন। বইমেলাকে উপলক্ষ করে প্রতিবছর যে বিপুল সংখ্যক লেখক-পাঠক প্রবাস থেকে দেশে আসেন তার একটা শুমারিও হতে পারে। এবার মেলা শুরুর প্রহর থেকেই কানাডা থেকে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, জসীম মল্লিক, সালমা বাণী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আহমদ মাযহার, বিশ্বজিত্ সাহা, যুক্তরাজ্য থেকে সাগুফতা শারমীন তানিয়াকে আসতে দেখলাম এই নগর ঢাকায়। তাদের মতো আরও আসবেন হয়তো কানাডা থেকে ফেরদৌস নাহার, লুত্ফর রহমান রিটন, ইকবাল হাসান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পূরবী বসু, হাসান আল আবদুল্লাহ, যুক্তরাজ্য থেকে শামীম আজাদ, জার্মানি থেকে নাজমুন্নেসা পিয়ারি, জাপান থেকে প্রবীর বিকাশ সরকার, অস্ট্রেলিয়া থেকে আফসানা বেগম এবং আরও অনেকেই। মেলা হচ্ছে ঢাকায়। আর উত্সবের ঢাকের বাদ্যি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোণায় কোণায়। কুমিল্লা থেকে বন্ধু প্লাবন ইমদাদ বলে রাখছে ফেব্রুয়ারি পনেরর পর মেলায় আসবে, আড্ডা হবে খুব। চট্টগ্রাম থেকে মনিরুল মনির আসবেন লিটলম্যাগ খড়িমাটি নিয়ে, বগুড়া থেকে শিবলি মোকতাদির আসবেন প্রত্ননগরের ঘ্রাণ নিয়ে, কক্সবাজার থেকে নিলয় রফিক আসবে সমুদ্রের হিম হাওয়াসমেত। কলকাতা থেকে অভিযান পাবলিশার্স থেকে মারুফ হোসেন আসবেন একুশের ফেব্রুয়ারি প্রহরে, মেলা যখন পূর্ণতার দিকে। বইমেলার দুয়ার খোলা মুহূর্তেই জার্নিম্যান স্টলে আড্ডা দিচ্ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মণি। তারপর সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন বাংলা ভাষার দুই বিশিষ্ট লেখক বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী দত্ত এবং জ্যোতির্ময় দত্ত। এসেছেন জাতীয় কবিতা উত্সবে; কিন্তু এক ফাঁকে একুশের বইমেলা ঘুরে না গেলে কি হয়! বলছিলেন তারা— পিতৃমাতৃভূমি বাংলাদেশে বইয়ের এমন বড় উত্সব তাদের মনে বইয়ে দিচ্ছে আনন্দের ঢল। বইয়ের স্টলে সাধারণ পাঠক থেকে দেশের শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিও তাদের দুইজনকে আনন্দ দিয়েছে ঢের। এই তো বাংলাদেশ, যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করে জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই কোনো।
তবে আনন্দের মাঝে সঙ্গে বেদনার দু’এক কথা না যোগ করলেই নয়। বইমেলার পরপর শুরু হয়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। আমাদের প্রশ্ন এই পরীক্ষাটি কি বইমেলার আগে-পরে হতে পারতো না? দেশের লাখ লাখ বইপ্রেমী ছাত্র-ছাত্রী বইমেলার আনন্দ থেকে পরীক্ষাজনিত কারণে যে অনেকটাই বঞ্চিত হবে সেটা আর উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। আমরা আশা করি, ভবিষ্যত্-বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ ব্যাপারে সুদৃষ্টি দেবেন যাতে সকল স্তরের শিক্ষার্থীর সঙ্গে বইমেলার প্রাণের যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ তারিখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন-তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন প্রস্তুতিকালীন সময়সহ নির্বাচন মওসুমে সে অঞ্চলের মানুষ মেলায় আসতে হয়তো বিঘ্ন অনুভব করতে পারে। নির্বাচন কমিশনও যেন ভবিষ্যতে এ বিষয়টি মাথায় রাখেন আমরা সে আশা করতেই পারি। কারণ আমরা চাই দেশের একজন বইপ্রেমী নাগরিকও যেন বইমেলার আনন্দ-হিল্লোল থেকে বঞ্চিত না হন। একমাসের বইমেলা আমাদের জীবনে আনুক বছরভর উত্সবের বেলা।
পিয়াস মজিদ : কবি ও প্রাবন্ধিক
