স্মৃতিশক্তি নষ্ট হইবার মতো বিপদ আর কী আছে?

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ২১:৩৬

মানুষের স্মৃতিশক্তি বিধাতার এক বিস্ময়কর আশীর্বাদ। মানুষ যত অভিজ্ঞ হয়, ততই তাহার স্মৃতিশক্তি মূল্যবান হইতে থাকে। বলা হইয়া থাকে, ৪০ বত্সরের পরে মানুষকে বিবেচনা করা হয় তাহার কর্মোভিজ্ঞতা দ্বারা। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি বয়সের একটি পর্যায়ে আসিয়া ক্রমশ তাহার স্মৃতিশক্তি হারাইতে থাকেন, তবে ইহার চাইতে খারাপ বিষয় আর কিছু হইতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান (১৯৮১—৮৯) ডিমেনশিয়ার কঠিন সমস্যায় আক্রান্ত হইয়াছিলেন। তিনি এমন বিস্মৃতির অতলে তলাইয়া গিয়াছিলেন যে, তিনি যে কোনো দিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাহাই ভুলিয়া যাইতেন!

বাংলাদেশেও বিপুল পরিমাণ মানুষ ডিমনেশিয়া তথা স্মৃতিবিলোপের সমস্যায় ভুগিতেছেন। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ব্যাপকতা :জাতীয় সমীক্ষার ফলাফল’ শিরোনামে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে আয়োজিত একটি ওয়েবিনারে জানানো হইয়াছে যে, দেশে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের প্রতি ১২ জনে এক জন ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিবিলোপ রোগে আক্রান্ত। এই রোগের উপসর্গ হিসাবে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করিবার ক্ষমতা হ্রাস পাইতে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ৫ কোটি মানুষের ডিমেনশিয়া রহিয়াছে, যাহার মধ্যে ৬০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে বসবাস করিতেছেন। গবেষণায় জানা গিয়াছে, নারীর মধ্যে সমবয়সি পুরুষের তুলনায় ডিমেনশিয়ার প্রকোপ আড়াই গুণ অধিক। মনে রাখিতে হইবে, ডিমনেশিয়া মূলত অধিক বয়সের রোগ। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অর্ধেকেরও অধিক মানুষের হাইপারটেনশন, হতাশা, ডায়াবেটিসসহ এক বা একাধিক দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা দেখা গিয়াছে। গবেষণায় তাহাদের পুষ্টির অভাব, উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ এবং উচ্চমাত্রায় তামাক সেবন করিতে দেখা গিয়াছে, যাহা সাধারণত নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা এনসিডি ঝুঁকির কারণ। ডিমনেশিয়ার অসংখ্য ধরন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে আলঝাইমার্স, ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া, ফ্রন্টো-টেম্পোরাল ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া ইত্যাদি। মস্তিষ্কের এই অবক্ষয়জনিত রোগটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ব হইতে বুঝা যায় না। কিছু কিছু উপসর্গের মাধ্যমে ডিমেনশিয়া ক্রমশ প্রকাশ পাইতে থাকে। বয়সজনিত কারণে ভুলিয়া গেলে ধামাচাপা দেওয়ার তাগিদটা থাকে না। অথচ অ্যালঝাইমার্স রোগীদের ক্ষেত্রে অবচেতনভাবেই রোগীরা বানাইয়া বানাইয়া ‘কিছু একটা’ বলিয়া নিজের স্মৃতিশক্তির অক্ষমতা ঢাকিবার চেষ্টা করেন অনেক ক্ষেত্রে। হয়তো দেখা যায় একদিন তিনি ব্যাংকে যান নাই, অথচ বেমালুম বলিয়া দিলেন যে তিনি ব্যাংকে গিয়াছেন। ব্যাংকের নাম ভুলিয়া গিয়া তিনি হয়তো মনগড়া এমন একটি নাম বলিলেন, যাহার কোনো অস্তিত্বই নাই। এইভাবে স্মৃতি ঝাপসা হইতে হইতে ক্রমশ লোপ পাইতে থাকে। চেনা লোক, চেনা জিনিস, চেনা জায়গা চিনিতে না পারা, জিনিসপত্র ভুল জায়গায় রাখা, কথা বলিবার সময় খেই হারাইয়া ফেলা, রাস্তায় বাহির হইয়া পথ হারাইয়া ফেলা ইত্যাদি ক্ষেত্রেই প্রাথমিক উপসর্গ হিসাবে প্রকাশ পায়। তবে নিজের ছেলের, নাতির নাম সাধারণত কেউ ভোলেন না। যুক্তি, বুদ্ধি, বোধও ঠিক থাকে। অ্যালঝাইমার রোগীর কিন্তু তাহা নহে, ইহাদের পরিবারের সহিত সম্পর্কিত বিষয়ও ভুল হইতে পারে। নিজের স্ত্রীর নাম ভুলিয়া যাইতে পারেন, এমনকি কখনো কখনো দেখা যায় নিজের নামও মনে করিতে পারিতেছেন না। বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, ২০২৫ সালে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইবে প্রায় পৌনে ১৩ লক্ষে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ইহা দ্বিগুণেরও অধিক হইবে। যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই সংখ্যা আরো বাড়িতে পারে।

ব্যক্তি পর্যায়ের মতো জাতিগত পর্যায়েও কি ডিমেনশিয়া দেখা দিতে পারে? কোনো কোনো সময় একটি জাতির মধ্যেও কি স্মৃতিভ্রংশতার সমস্যা প্রকট হইতে পারে? ইহা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাই ভালো বলিতে পারিবেন। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের মতো জাতিগত পর্যায়েও ডিমেনশিয়া দেখা দিলে তাহা ঐ জাতির জন্য দুর্ভাগ্য বহিয়া আনে।