ব র্তমান সময়ে মাদকাসক্তি মহামারির আকার ধারণ করেছে। করোনায় ঘরবন্দি সময়ে এই মাদকে আসক্তির পরিমাণ বেড়েছে বহু গুণে। কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদকের ভয়াল থাবায়। বিভিন্ন ধরনের জীবন বিধ্বংসী মাদকে সয়লাব আজ দেশ। এলএসডির মতো মাদক আজ পৌঁছে গেছে দেশে সর্বস্তরে। মাদকের বেড়াজালে তরুণরা বেশি আটকে গেলেও মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষায় তরুণ সমাজ হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। মাদকাসক্তি নির্মূলে তরুণদের ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন— মোহাম্মদ ইয়াছিন ইসলাম
ঠেকাতে হবে মাদকের অবৈধ অনুপ্রবেশ
—ইব্রাহীম হোসেন
শিক্ষার্থী, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে মাদকের সরবরাহ প্রতি বছরই ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্ত ও বন্দরের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে প্রায়ই মাদক পাচারের খবর পাওয়া যায়। প্রতি বছর যে পরিমাণ মাদক দেশের অভ্যন্তরে পাচার করা হচ্ছে অভিযানের মাধ্যমে তার নগণ্য অংশই ধরা পড়ে। যেহেতু অবাধ সরবরাহ রয়েছে, তাই মাদকের ব্যবহারও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। আমি মনে করি, দেশের
বাইরে থেকে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব না হলে এর কার্যকর নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হবে না। দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান দেখা যায়, সেখানে অল্প পরিসরে মাদক সরবরাহকারীদের গ্রেফতার করা গেলেও তথাকথিত প্রভাবশালী মাদকের গড ফাদাররা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যার ফলে মাদকের সরবরাহ কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আমার মতে, মাদকের সরবরাহ কার্যকরভাবে রোধ করা গেলে অপ্রতুলতার ফলে চাহিদাও কমতে থাকবে। এর জন্য দেশের সীমান্ত ও বন্দরগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার বিকল্প নেই।
মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো
টলারেন্স নীতি দরকার
—হাসনাতুজ্জাম তানিম
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতাই মাদকাসক্তির প্রথম কারণ। এছাড়া মাদকদ্রব্যের প্রতি আগ্রহ থেকে এক-দুইবার মাদক সেবনের পর এটার প্রতি আসক্তি তৈরি হয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিত্সা খরচ অনেক ব্যয়বহুল, এই চিকিত্সা খরচটা সব পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে সরকারি অনেক মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে খুব কম খরচে মাদকাসক্তি ব্যক্তির চিকিত্সা করানো যায়। তবে আমাদেরকে প্রথমেই ভাবতে হবে একজন ছেলে কিংবা মেয়েকে মাদকাসক্ত হওয়ার আগে থেকেই খেয়াল রাখা। মাদকাসক্তি নির্মূলের জন্য প্রথমেই যেটা করা উচিত্ তা হলো, মাদকদ্রব্য সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এবং মাদকদ্রব্যের উত্সমূল বন্ধ করে দেওয়া। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে বেশির ভাগ মাদকদ্রব্য আসে সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে। তাই সবার আগে সীমান্ত পথে মাদকদ্রব্য আসা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
বাধ্যতামূলক করতে হবে ডোপ টেস্ট
—মুহাম্মদ সুলতান মাহমুদ
শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
মাদকাসক্তি একটি নীরব ঘাতক। এটি পরিবার, সমাজ ও দেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কমপক্ষে ৭০ লাখ মানুষ সরাসরি মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ পুরুষ, ১৩ শতাংশ নারী। সমাজে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ মাদক। আমাদের মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে খুবই কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে সব ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা। তবে শুধু অভিযান চালিয়েই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।
প্রয়োজন পরিবারের কঠোর নজরদারি
—ইমরান হোসাইন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে মাদকাসক্তের বেশির ভাগই তরুণ ও কিশোর বয়সের। পরিবারের সঠিক নজরদারি না থাকার কারণে এসব তরুণ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এসব কিশোর বা তরুণের কোনো আয়ের মাধ্যম নেই। যে কারণে তাদের টাকা পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম পরিবার। পরিবার যদি এক্ষেত্রে সচেতন হয়, তাহলে আমার মতে তরুণদের মাদকে আসক্তের হার অনেকাংশে লাঘব হবে। এছাড়া সন্তান কোথায় যাচ্ছে বা কাদের সঙ্গে মিশছে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে
—আল আমিন
শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
মাদকের ভয়াবহতা বিশাল। এর কুফল লেখে শেষ করা যাবে না। যুবশক্তিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে মাদকের ভয়াল ছোবল। মাদকাসক্তি থেকে বাঁচতে এবং এটি নির্মূল করতে হলে প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ভয়াবহ সমস্যার সমাধান করতে হবে। ‘মাদককে না বলুন’—এই প্রতিপাদ্যে মিছিল, মিটিং, র্যালি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটা কার্যকর মাধ্যম হতে পারে এই সমস্যা সমাধানে। টিভি, রেডিওতে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা যেতে পারে।
মানতে হবে ধর্মীয় অনুশাসন
—মো. পলাশ হোসাইন
শিক্ষার্থী, ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল
বর্তমান সমাজে দেখা যায়, নেশার টাকা সংগ্রহে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তরুণ সমাজকে মাদকাসক্তির এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সঠিক ধর্মীয় অনুশাসন এবং পরিবারের সুশিক্ষা। প্রতি বছর যে পরিমাণ মাদক দেশের অভ্যন্তরে পাচার করা হচ্ছে অভিযানের মাধ্যমে তার নগণ্য অংশই ধরা পড়ে। মাদকাসক্তি নির্মূলের জন্য প্রথমেই যেটা করা উচিত্ তা হলো, মাদকদ্রব্য সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং মাদকদ্রব্যের উত্সমূল বন্ধ করে দেওয়া।
