কান কথা-১

করোনাকালে বিদেশযাত্রা যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ করা!

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২১, ১৬:২৪

মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের বাইরে ভ্রমণ মানেই পাহাড়সম ঝামেলা সামলানো। তবু দুই বছরেরও বেশি সময় পর কান চলচ্চিত্র উৎসব আবার হবে বলে অ্যাক্রেডিটেশন নিয়ে রেখেছিলাম। যদি যেতে পারি!

গত পাঁচবার কান উৎসবে সংবাদকর্মী হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন পেতে কোনো টাকা-পয়সা লাগেনি। প্রতিবার শুধু আগের বছরের লেখা কয়েকটি রিপোর্ট, অফিসিয়াল লেটার আর কিছু তথ্য দিয়েই ব্যাজ পেয়েছিলাম। 

কিন্তু এবার আয়োজকরা ইমেইলে জানায়, অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে পরিবেশের সুরক্ষায় ২০ ইউরো (ট্যাক্সসহ ২৪ ইউরো) করে নেওয়া হবে। তবুও অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করলাম। পেয়েও গেলাম। তখন ভাবলাম— কানে এবার যদি যেতে নাও পারি, পরিবেশের কল্যাণে সামান্য অবদান তো রাখতে পেরেছি!

মোটামুটি ৩ জুনের আগ পর্যন্ত এবার কানযাত্রার কোনো পরিকল্পনা ছিলো না। দক্ষিণ ফ্রান্সে ভূমধ্যসাগরের তীরে যাওয়ার ভাবনাটা আবার পেয়ে বসলো ওইদিন। কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো যখন জানালেন, ৭৪তম আসরের আঁ সার্তে রিগা’য় জায়গা পেয়েছে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। কানের ইতিহাসে প্রথমবার অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশ! তাও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে। গর্বে বুকটা ভরে গেলো।

২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা পাঁচবার কানে এসেছিলাম। উৎসবে বিভিন্ন দেশের নানান রঙের ছবি দেখেছি। কিন্তু অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র না থাকার একটা অতৃপ্তি ছিলো। যদিও বলেকয়ে এই সম্মান অর্জন করা যায় না। তাও আশা ছিলো, একদিন কানে নির্বাচিত বাংলাদেশের ছবি পালে দে ফেস্টিভাল ভবনে বসে দেখবো। এবার সেই আশা পূরণ হওয়ার সুযোগ সামনে। কিন্তু যাবো কীভাবে!

এমনিতে বাংলাদেশ আছে ফ্রান্সের লাল তালিকায়! ঢাকায় দেশটির দূতাবাস অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টসহ বেশিরভাগ স্বাভাবিক কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রেখেছে। তার ওপর করোনা প্রতিরোধক টিকার কোনো ডোজই নেওয়া হয়নি আমার। সব মিলিয়ে কূলকিনারা পাবো বলে মনে হলো না। দুই মাস আগেও টিকা নিয়ে আগ্রহ দেখাইনি। কিন্তু জুনের দ্বিতীয় দিন থেকে টিকার জন্য হন্যে হয়ে গেলাম! কিন্তু কোথাও টিকা নেই। এর মধ্যে একদিন সকালে ইত্তেফাকে প্রধান খবরের শিরোনাম দেখলাম, টিকার জন্য হাহাকার। 

কান থেকে একটি ইমেইল পেয়ে কপালের চিন্তার ভাঁজ আরও বাড়লো। উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের কেউ করোনা প্রতিরোধক টিকা না নিয়ে থাকলে প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পরপর কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাতে হবে। তা না হলে পালে দে ফেস্টিভাল ভবনে ঢোকা যাবে না। তবুও হাল ছাড়লাম না। কিন্তু কীভাবে ভিসা পাবো তা ভেবে ভেবে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। দিন যায় আর আফসোস বাড়ে। আহারে! এবার বাংলাদেশ থাকবে, আর এবারই যেতে পারবো না!

হতাশার মাঝে কিঞ্চিৎ আশার আলো দেখালেন সংবাদকর্মী পার্থ সনজয়। সত্যি বলতে তার গুঁতোগুঁতিতেই টাকা দিয়ে অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করেছিলাম। এবার তিনি ফোন দিয়ে জানালেন, দূতাবাস থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন! আমি শুনে অবাক। তিনি যাকে (অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ করা হলো না) অনুরোধ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন তাকে ফোন করার পরামর্শ দিলেন পার্থ সনজয়। দেরি না করে ফোন দিলাম। ভদ্রলোক একজনের (তারও অনুমতি না থাকায় নাম বলা গেলো না) ইমেইল ঠিকানা দিলেন। সেখানে ইমেইল করার পর অ্যাপয়েন্টমেন্টের চাওয়ার জন্য দূতাবাসের একটি ইমেইল ঠিকানা দেওয়া হলো। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় উত্তর আসার পর খুব একটা আশা দেখলাম না। 

শেষ পর্যন্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম। কিন্তু পরদিন সকাল ১১টায় ডাক পড়েছে। হাতে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়। কীভাবে কী করি! মেলা কাগজ নিয়ে যেতে হবে। ভিসার আবেদনপত্র, পাসপোর্ট, দূতাবাসের নিয়ম-কানুন মেনে তোলা দুই কপি ছবি, পাসপোর্টের অনুলিপি, আগের ভিসার অনুলিপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, দূতাবাস অনুমোদিত বিমা প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিমা, উড়োজাহাজের টিকিট বুকিং, হোটেল বুকিং, ভিসা ফি, কান উৎসবের আমন্ত্রণপত্র, সম্পাদকের চিঠি এবং আবেদনপত্র দূতাবাসের অনলাইনে সাবমিট করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা কাগজ। সব কাগজপত্রের দুই কপি করে নিয়ে যেতে হয় দূতাবাসে। এগুলোর একেকটি সংগ্রহ করতে একেক দিকে যেতে হবে। যানজটের শহরে সহকর্মী মাঈন উদ্দিন আরিফ মোটরসাইকেলের জাদুতে অনেকটা সময় বাঁচিয়ে দিলেন!

ফ্রান্স দূতাবাস থেকে যেদিন পাসপোর্ট দেওয়ার কথা তার তিন দিন আগে ইমেইলে জানানো হলো, অন্যদিন যেতে হবে। মুহূর্তেই পার্থ সনজয়ের ফোন। তিনি আমার একদিন আগে পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন, তাকেও একই ইমেইল পাঠানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দূতাবাস থেকে আরেকটি ইমেইলে পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য যেতে বলায় স্বস্তি পেলাম আমরা।

মাল্টিপল ভিসার সঙ্গে এবার দুটি কাগজ ধরিয়ে দিলো ফ্রান্স দূতাবাস। এর একটি হলো ‘লাসেই-পাসে’ অর্থাৎ পারমিট। অন্যটিতে কোভিড পরিস্থিতির কারণে ফরাসি ভাষায় কিছু দিকনির্দেশনা ও একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা। এবার শুধু ভিসা থাকলেই হবে না, সঙ্গে এগুলো এবং করোনা নেগেটিভ সনদও লাগবে। নেমে পড়লাম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে! কান উৎসবে অংশগ্রহণ করা ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। এত অর্থকড়ি সংগ্রহ আর প্রয়োজনীয় দিস্তা দিস্তা কাগজপত্র প্রস্তুত করা বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে কম কী! তবে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশক তারিন হোসেন অর্ধেক কাজ সহজ করে দিলেন। কানে যেতে আমার অতি আগ্রহ দেখে নগদ চেক লিখে দিলেন। ভিসা পেয়ে তাকে ফোন করার পরই কত খরচ হবে সেই হিসাব পাঠাতে বলেছিলেন। খরচাপাতির ব্যাপারে তখন থেকেই কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। তাছাড়া পৃষ্ঠপোষক এনে দেওয়ার জাদুকর হেড অব মার্কেটিং (ডিজিটাল) শরাফত হোসেন তো আছেনই! সুতরাং খরচ মোটামুটি উঠে আসবে।

কানে গত পাঁচবারের ভ্রমণে চারবারই তার্কিশ এয়ারলাইনসে যাতায়াত করেছি। এবারও ঠিক করেছি ইস্তানবুল হয়ে নিস যাবো। কিন্তু টিকিটের চড়া মূল্য শুনলেই হৃৎপিণ্ড থেমে যাওয়ার জোগাড়! কম করে হলেও ১০ জন ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। শরাফত হোসেন, স্পোর্টস রিপোর্টার নোমান আব্দুল্লাহ, নির্মাতা জসীম আহমেদ, মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ, একাত্তর টিভির ক্যামেরা পারসন লেনিনসহ আমার আত্মীয়স্বজনদের পরিচিত সব ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন দিয়েও কাঙ্ক্ষিত বাজেটে টিকিট পাচ্ছিলাম না। অবশেষে দেশ টিভির বিপণন প্রধান রানা সিনহার পরিচিত ট্রাভেল এজেন্ট আশিক তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে তা এনে দিলেন।

পরদিন ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটে ফ্লাইট। তাই দুপুর ১২টার মধ্যে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে করোনার স্যাম্পল দিলাম। রাত ১১টার মধ্যে রিপোর্ট চলে আসবে জানানো হলো। শরাফত হোসেন টাকা নিয়ে মহাখালী এলেন। তাকে নিয়ে টিকিট সংগ্রহের পর মুদ্রা রূপান্তর করে নিলাম ইউরোতে। এরপর শুরু হলো কাগজ তৈরির কাজ। বিসিএস পরীক্ষাতেও হয়তো এতকিছু পূরণ করতে হয় না!

রাত ১১টা পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা ১২টার ঘর ছুঁয়েছে। সহকর্মী কবির হোসেন কোল্ড ড্রিংকস-বিস্কুট নিয়ে এসেছেন। কিন্তু করোনার নমুনা পরীক্ষার ফল এখনো আসেনি। শরাফত হোসেন একের পর এক ফোন দিয়ে যাচ্ছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেলে। ‘আর ১০ মিনিট’, ‘আর ২০ মিনিট’ করে করে ১২টা বাজালো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাও স্বস্তির খবর, রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। শেষ পর্যন্ত রাত দেড়টা বেজে গেলো অফিস থেকে সনদটি প্রিন্ট নিয়ে বেরোতে। ভাগ্যিস সকালে হাসপাতালে যাওয়ার সময় লাগেজ গুছিয়ে রেখেছিলাম। রাত দুইটায় ঘরে ফিরে কোনোরকম দু’চারটা ভাত মুখে দিয়ে আধঘণ্টার মধ্যে বাসা থেকে বের হতে হলো।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢোকার পর করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট সত্যায়িত করার জন্য সারি বেঁধে দাঁড়াতে হলো। লম্বা লাইন। সত্যায়িত হওয়ার পর বোর্ডিং পাস নেওয়ার পালা। জানালার পাশে আসন দেওয়ার অনুরোধ জানাতে ইস্তানবুল থেকে নিস পর্যন্ত খালি পাওয়া গেলো। উড়োজাহাজে ওঠার লাইন কমছে ধীরে ধীরে। মন বলছিলো, আরও দেরি হোক! কখনো কখনো দেরি হলেও ভালো লাগতে পারে। কারণ ঢাকায় যত দেরি হবে, ইস্তানবুলে ট্রানজিটের সময় তত কমবে। সব মিলিয়ে ২০ ঘণ্টার ট্রানজিট! ইস্তানবুলে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টা ১০ মিনিট) নামবো। পরদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে নিস যাওয়ার কানেক্টিং ফ্লাইট। টিকিট কেনার সময় এই তথ্য জানার পর থেকে দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো, কীভাবে কাটবে এতটা সময়। আল্লাহ জানে!

ইত্তেফাক/জেএইচ