সুমন্ত গুপ্ত
হেমন্তের পাকা ধানের সুবাস শেষ হলেই উত্তরের হিমেল বাতাসে ভর করে পরিযায়ী পাখিরা আসে আমাদের দেশে। তীব্র শীত ও খাদ্যাভাব থেকে বাঁচার জন্য হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এই পাখিরা আসে সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, হিমালয়ের পাদদেশ, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। আসতে শুরু করে নভেম্বর মাসে এবং এপ্রিল পর্যন্ত থাকে। এই অল্পদিনেই পাখিগুলো হয়ে যায় আমাদের বন্ধু। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে এই পাখিরা।
এবার সেই পাখির খোঁজে আমরা বের হয়েছিলাম এক পড়ন্ত দুপুরে। এবারও সঙ্গী আমার মা ও নুরুল ইসলাম ভাই। গন্তব্য স্থানটা আমরা চিনি না, তবে একবার শুনেছিলাম পারাইরচক। যাই হোক, যাত্রা শুরু করলাম আমরা।
শহর থেকে বেরিয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। হাতের ডান পাশে রেললাইন। কিছুক্ষণ পর নুরুল ভাই বললেন, ‘দাদা, পারাইরচক তো এসে গেলাম, পাখি কই?’ আমি ডান-বাম তাকাতে লাগলাম। পাখির তো দেখাই নেই। মনে মনে ভাবলাম, আগে একবার অতিথি পাখি দেখতে গিয়ে তিন দিন ঘুরতে হয়েছে জায়গা খুঁজে বের করতে, আজও কি সেই রকম হতে চলল কি না। মা বলল, ‘চল অন্য কোথাও যাই, এখানে পাখি আসে না হয়তো।’ আমি আবার সহজেই হার মানার পাত্র না, তাই বললাম, ‘আরেকটু সামনে যাই, না পেলে ফিরে যাব।’ কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাত্ চোখে পড়ল কয়েকটা সাদা বক উড়ে যাচ্ছে। দেখে আমার মন আনন্দে নেচে উঠল। এই তো পেয়েছি! ঝিলের জলে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি বসে আছে। আরেকটু সামনে যেতেই দেখা মিলল পরিযায়ী পাখিরা আপন মনে বসে আছে। নেই কোনো কোলাহোল। নেই কোনো পাখি শিকারির দল। বলে রাখা ভালো জীবজগতের মধ্যে পাখিরাই সর্বাধিক পরিযায়ী। শীতের এসব পাখিকে অতিথি পাখি বলেন অনেকে। পাখি অতিথি নয়, পাখি কোনো দেশের নয়। তবে পাখিদের দেশভিত্তিক একটা তালিকা থাকতে পারে। অতিথি পাখি বলে কোনো শব্দ পৃথিবীর কোথাও ব্যবহূত হয় না। কোনো পাখি একদিন মাত্র কোনো দেশে থাকলে সে পাখিটা সেই দেশের পাখি হয়ে যায়। যে পাখি সারা বছর এ দেশে বাস করে, তাকে আমরা বলি আবাসিক পাখি (Resident Bird)। যে পাখি বছরের পুরোটা সময় এ দেশে না থেকে নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করে, তাদের পরিযায়ী পাখি (Migratory Bird) বলা হয়। আমাদের দেশে ৬৫০ প্রজাতির পাখির একাংশ গ্রীষ্মে আহার, বাসস্থান ও প্রজননের জন্য হিমালয়ের তুষারঢাকা অঞ্চল হয়ে সুদূর সাইবেরিয়া ও তুন্দ্রা অঞ্চলে চলে যায়। এসব পাখির কোনোটা তিন মাস, কোনোটা ছয় মাস ওই অঞ্চলে থাকে। তারপর আবার দেশে ফেরে। ১০ থেকে ১৫ প্রজাতির যেসব পাখি শীতের সময় দেশে থাকে না, তারা হলো সুমচা ও কোকিল প্রজাতির পাখি। যাই হোক, আমরা পাখিদের আরও কাছে যেতে চাইলাম। অনেক দূরে দেখলাম একটা ডিঙ্গি নৌকা। নুরুল ভাই মাঝিকে ডাকতে শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে মাঝি আসতে শুরু করলেন। বলে রাখা ভালো, এখানে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। আর তাই খুব সাবধানে ঝিলের পাশে নামতে হবে। ডিঙ্গি নৌকা কাছে আসার পর আমি আর নুরুল ভাই রাস্তা থেকে ঝিলের দিকে নামলাম। খুব সাবধানে পা বাড়ালাম। কারণ এঁটেল মাটি। নৌকা আসার পর নৌকাতে উঠতে গিয়ে দেখি নৌকা দিয়ে জল উঠছে। তাই একবার ভেবেছিলাম নৌকায় উঠব না। কিন্তু আরও কাছ থেকে পরিযায়ী পাখি দেখার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। ঝিলের জলে আমরা ভাসছি। ক্যামেরা তাক করে একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছি। অসাধারণ সে দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ঝিলের জলে পাখিদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য যে কারওর মন ভরিয়ে দেবে। যদিও এ স্থানটি এখনো লোক চক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। যারা সিলেট ঘুরতে আসেন, খুব স্বল্প সময় নিয়ে তারা সহজেই ঘুরে আসতে পারেন পারাইরচকে। অস্তগামী সূর্যের সঙ্গে আমাদেরও বিদায়ের পালা চলে এলো। আমরা পাখির মতো ফিরে চললাম আমাদের নীড়ে।
প থে র ঠি কান া
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে যাত্রাবাড়ি বা কমলাপুর। এখান থেকে বাসে অথবা ট্রেনে করে সিলেট। সিলেটের রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ সুরমা পারাইরচক বললেই যে কেউ চিনিয়ে দেবে। অথবা গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে যেতে পারেন পারাইরচকে। ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা।
