বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
সরকারি হাইমচর মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর
হাওর এলাকার জমিদারের মৃত্যুর পূর্বে তার অল্প বয়স্ক নাতিকে উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্ষমতা প্রদান করেন। কতিপয় আত্মীয় স্বজন এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার কিছু লোভী ব্যবসায়ী বিদেশী ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
ক) ভারত শাসন আইন পাস হয় কোন সালে ? খ) ‘ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি’- ব্যাখ্যা কর। গ) হাওর এলাকার ঘটনা বাংলার ইতিহাসে কোন ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয় ব্যাখ্যা কর। ঘ) ‘আধুনিক জ্ঞনচর্চার ফলে উক্ত এলাকায় নবজাগরণ ঘটেছিল’- যৌক্তিক মতামত দাও।
ক) উত্তর: ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট ভারত শাসন আইন পাস ।
খ) উত্তর: ১৬৪৮ সালে ইউরোপের যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পাদিত সন্ধিটিই হলো ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি। ইউরোপের দেশগুলো স্পেন,ফ্রান্স,পর্তুগাল, নেদারল্যান্ড, ওয়েস্টফারলিয়ার জার্মানি,সুইডেন, ডেনমার্ক, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে প্রায় ৩০ বছর (১৬১৮-১৬৪৮) পর্যন্ত যুদ্ধ পরিচালিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় ৮০ লক্ষ সামরিক-বেসামরিক লোক হতাহত হয়। এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো এবং পূণ:রায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি সম্পাদিত হয়।
গ) উত্তর: হাওর এলাকার ঘটনা পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ নবাবের পতন এবং ঔপনিবেশিক শক্তি ক্ষমতা দখলের ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। উদ্দীপকে হাওর এলাকার জমিদারের মৃত্যুর পূর্বে তার অল্প বয়স্ক প্রিয় নাতিকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনিত করেন। কিন্তু নব নিযুক্ত জমিদারের বিরুদ্ধে তার আত্মীয় স্বজন এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার কিছু লোভী ব্যবসায়ী,বহিরাগত শক্তি সম্মিলিতভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং পরবর্তীতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৫৬ সালে নবাব আলীবর্দী খাঁনের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা বাংলা,বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হন। মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসার পর সিরাজউদ্দৌলা নানামুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হন। একদিকে পারিবারিক ও ঘনিষ্টজনদের ষড়যন্ত্র যেমন মোকাবিলা করতে হয়েছে,অন্যদিকে ইংরেজ শক্তি,হামলাকারী বর্গি, ক্ষমতালোভী বণিক শ্রেণির হস্তক্ষেপও তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। ফলশ্রুতিতে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে পরাজিত হন এবং বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়।
ঘ) উত্তর: ’আধুনিক জ্ঞানচর্চার ফলে উক্ত এলাকায় নবজাগরণ ঘটেছিল’-উক্তিটি যথার্থ। জ্ঞানচর্চা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। জ্ঞানই একমাত্র শক্তি যার অনুধাবনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার আপন শক্তিকে চিনতে এবং জাগিয়ে তুলতে পারে। ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজরা তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠে। দেশীয়দের মধ্য থেকে ইংরেজি শিক্ষিত একটি অনুগত শ্রেণি তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার ধারাবাহিকতায় ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা এবং ১৭৯১ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক শিক্ষা প্রচলনের ফলে বাংলার স্থানীয় জনগণের মাঝে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং বহুকালের প্রচলিত বিশ্বাস, নানা সংস্কার,বিধান সম্পর্কে তাদের মনে সংশয় ও প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। হিন্দু সমাজ থেকে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় এবং বিধাবা বিবাহ প্রচলনের পক্ষে ইতিবাচক জনমত তৈরি হয়। ১৮২১ সালে শ্রীরামপুর মুদ্রণযন্ত্র, ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে মননশীলতা,সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথ সুগম হয়। ফলে এ দেশে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সীমিত কিন্তু কার্যকর জোয়ার সৃষ্টি হয়। শিক্ষার এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে উদ্দীপকে উল্লেখিত এলাকার মানুষের মাঝে অধিকার সচেতনা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। উপরের আলোচনা প্রেক্ষিতে বলতে পারি আধুনিক জ্ঞানচর্চার বিকাশ বাঙালির নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে, যার সূত্র ধরে দীর্ঘ দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে।
