সড়ক দুর্ঘটনা এবং তড়িতায়িত হওয়া বন্যপ্রাণীদের জন্য প্রধান হুমকিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিক উন্নয়ন যেমন আমাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে, অন্যদিকে এই উন্নয়ন কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের পরিবেশ এবং প্রতিবেশের জন্য। এই উন্নয়নের পথ ধরে বনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মহাসড়ক, নেওয়া হচ্ছে বিদ্যুত্ সরবরাহের তার। যার ফলে রাস্তা পার হয়ে বনের এক দিক থেকে অন্য দিকে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনা এবং তড়িতায়িত হয়ে প্রাণ যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর। এই একই চিত্র আমাদের দেশেও আমরা দেখতে পাই। অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নির্মম মৃত্যু হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বনে।
এই সমস্যা কিছুটা সমাধানের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেন বন্যপ্রাণী গবেষক দম্পতি হাসান আল-রাজী ও মারজান মারিয়া। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এই দুই শিক্ষার্থী ‘Artificial Canopy Bridges For Conservation’ নামক একটি প্রকল্প হাতে নেন। এই প্রকল্প মূল গবেষক মার্জান মারিয়া ২০১৯ সালে এক্সপ্লোরার ক্লাব নামের আমেরিকান একটি সংস্থায় এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করেন এবং কিছু আর্থিক সহযোগিতা পান। এছাড়াও গবেষণা ও সংরক্ষণের কাজের জন্য ‘Plumplorise.V’ নামের একটি জার্মানভিত্তিক দাতা সংস্থার সহযোগিতা নেন। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো—সাতছড়ি বনে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে কৃত্রিম সংযোগ করে দেওয়া। যাতে তারা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে। পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের সহায়তায় সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করেন ব্রিজ নির্মাণের জন্য। ২০২০ সালের ১ নভেম্বরে ব্রিজগুলো স্থাপনের কাজ শেষ হয়। পরে তিন মাস অপেক্ষা করেন যাতে বন্যপ্রাণীরা ব্রিজটি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। প্রকল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবির বিন মুজাফফর এবং অক্সফোর্ড ব্রুক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনা নেকারিস। এই কাজে সহযোগিতা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আলী আকবর রাফি।
মারজান মারিয়া বলেন, আমরা তিন মাসের পরে আমাদের ব্রিজের এক পাশে একটি করে ক্যামেরা ট্রাপ স্থাপন করি বন্যপ্রাণীর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য। ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ক্যামেরা ট্রাপ স্থাপন করি এবং দুই সপ্তাহ পর পর ক্যামেরা ট্রাপ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ জন্য সাতছড়ি বনে যাই। ইতিমধ্যেই আমরা আমাদের ক্যামেরা ট্রাপে বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর চলাচলের ছবি পেয়েছি। যাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বানর, হনুমান এবং বিভিন্ন ইঁদুরগোত্রীয় প্রাণী। আমাদের দেশে এমন আরো কিছু বন আছে যার ভেতর দিয়ে এমন মহাসড়ক এবং বৈদ্যুতিক তার গেছে। এই বনগুলোতেও যদি বনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন জায়গাগুলোতে এমন কৃত্রিম সেতু নির্মাণ করা যায় তবে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর মিছিল কিছুটা হলেও কমানো যাবে, এর সঙ্গে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষাও করতে পারব।
