কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২১, ২১:০৯

মসলা, খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বৃদ্ধিতে যার জুড়ি নেই! মসলার গন্ধ যেন দূর থেকেই বলে দেয় পাশের বাসায় আজ কী রান্না হচ্ছে। তবে মসলার গন্ধ কি এতটাই তীব্র হতে পারে যেটি পৌঁছে যাবে ভারতবর্ষ থেকে সুদূর ইউরোপে? না, বাস্তবে তো এমনটা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, মসলার নাম আর সুখ্যাতি তো নিশ্চয়ই পৌঁছে যেতে পারে। আর ঠিক এমনটাই হয়েছিল আজ থেকে প্রায় কয়েকশো বছর আগে। ভারতীয় মসলার সুখ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত। আর এই মসলাকে আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যেই ইউরোপীয়রা চিরকাল ভারত ও এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দ্বীপপুঞ্জগুলোতে পাড়ি দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। আজ আমরা জানবো কীভাবে ভারতের মসলা আমদানির উদ্দেশে বের হয়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন আজকের আমেরিকা। নানারকম সুগন্ধি মসলার ভাণ্ডার ছিল ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ও দ্বীপপুঞ্জগুলো। এগুলোকে ইউরোপীয়রা একত্রে East Indies বলে অভিহিত করত। তবে প্রথম দিকে মসলার ওপর আরবীয় ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। আরবীয়রা সাধারণত পারস্য উপসাগর হয়ে ভারতে এসে এ মসলা নিয়ে যেত নিজেদের দেশে এবং সেখান থেকেই রপ্তানি করত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে পৌঁছানোর কারণে ইউরোপকে এই মসলা কিনতে হতো বেশ চওড়া দামে। তাই ইউরোপের ব্যবসায়ীদের এই East Indies-এর দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য করার এক অদম্য ইচ্ছা তো ছিলই তবে সেখানে সোজা পথে পৌঁছানোর রাস্তাই ছিল বাধা। ইউরোপ থেকে সরাসরি ভারতে আসার কোনো জলপথ তখন পর্যন্ত তাদের জানা ছিল না। ধীরে ধীরে ইউরোপীয়রা পুরাতন গ্রিক ও রোমান গ্রন্থগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে তখনকার স্বর্ণখনি তথা ভারতবর্ষ সম্পর্কে আরো বিস্তৃতভাবে জানতে লাগল। আর এই স্বর্ণখনি ভারতবর্ষের ধনসম্পদ ও মূল্যবান মসলাকে হস্তগত করার এক আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে জেগে উঠল। স্বভাবত তখনকার অন্যান্য ব্যবসায়ী ও নাবিকদের মতো ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মনেও জেগে উঠেছিল East Indies-এ কোনোভাবে পৌঁছে সেখানে একপ্রকার ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা। চাঁদ ও সূর্যের মতো পৃথিবীর আকৃতিও যে গোল সেই ধারণা ততদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। তাই কলম্বাস ভাবলেন, ইউরোপ থেকে পূর্বের রাস্তা হয়ে যেমন East Indies-এ পৌঁছানো যায়, তেমনই পশ্চিমের সমুদ্র পাড়ি দিলেও সেখানে পৌঁছানো যাবে। তবে বাস্তবে পৃথিবীর পরিধি যে এতটা বিশাল সেটা হয়তো কলম্বাস বুঝে উঠতে পারেননি। তাঁর গণনা অনুযায়ী পশ্চিমে পাড়ি দিলে খুব কম দূরুত্ব অতিক্রম করেই ভারতবর্ষে পৌঁছানো যাবে। তাই তিনি তাঁর এই পরিকল্পনা নিয়ে অর্থ জোগাড়ের আশায় গেলেন পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জন-এর কাছে। কিন্তু রাজা কলম্বাসের এই small earth theory বিশ্বাস করলেন না এবং তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। ১৪৯২ সাল, সালটা ক্যাথলিকদের জন্য অত্যন্ত শুভ। গ্রানাডা বিজয়ের আনন্দে তখন মাতোয়ারা তারা স্পেনে। এই শুভক্ষণকেই কাজে লাগিয়ে ক্যাথলিক নাবিক কলম্বাস দেখা করতে চাইলেন রানি ইসাবেলার সাথে। রানির সাথে কয়েক বছর আগেও তিনি দেখা করেছিলেন। কিন্তু সে-বার তিনি রানিকে রাজি করাতে পারেননি। তবে এখনকার কথা তো আলাদা, বিজয় উল্লাসে এখন রানি মহাখুশি। এখন তো রানি রাজি হবেন। তা-ই হলো, কলম্বাসের প্রস্তাবে রানি ইসাবেলা রাজি হয়ে গেলেন। কলম্বাস তাঁকে আশা দিলেন পশ্চিমের নতুন গতিপথ দিয়ে ভারত পৌঁছাতে পারলে প্রচুর ধনসম্পদ পৌঁছে যাবে রানির কাছে। পশ্চিমের এই পথ হবে পূর্বের চাইতেও সহজতর। এতে করে ক্যাথলিজমও আরো কয়েকগুণ বেশি প্রসারিত হবে। রানি এ যাত্রায় সম্মতি দেন এবং কলম্বাসের যাত্রাপথের খরচ বহন করেন। ১৪৯২ সালের আগস্ট মাসে ৩টি জাহাজ ও প্রায় ৯০ জন নাবিক নিয়ে শুরু হলো তাদের ভারতবর্ষে পৌঁছানোর নতুন পথের সন্ধানে সমুদ্রযাত্রা। আটলান্টিকের অসীম জলরাশি তাদের স্বাগত জানাল। কিন্তু যাত্রাপথের প্রতিকূলতা নাবিকদের সম্পূর্ণ হতাশ করে দেয়। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও স্থলভাগের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যাত্রার দুই মাস পর অক্টোবর মাসে সমুদ্রে ঘুরে ঘুরেও কোনো ডাঙা দেখতে না পাওয়ায় নাবিকরা বিদ্রোহ করে বসল। কলম্বাস নাবিকদের কথা দিলেন দুই-এক দিনের মধ্যে ডাঙা দেখা না গেলে তিনি ফিরে যাবেন। কিন্তু পরের দিনই পানিতে গাছের ডাল ভেসে আসতে দেখে তাদের হতাশ মনে আশা জেগে উঠল, বুঝতে পারল ডাঙা খুব কাছে কোথাও রয়েছে। সবাই অধীর আগ্রহে আছে ডাঙা দেখার অপেক্ষায়। ১২ অক্টোবর ১৪৯২, কলম্বাস তাঁর দলবল নিয়ে অবতরণ একটি দ্বীপে। তিনি দ্বীপটির নাম দেন সান সালভাদর, যেটি আসলে আজকের বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি। কলম্বাস ভাবলেন তিনি ভারতের কোথাও অবতরণ করেছেন। কিন্তু এই ভারতীয়দের গায়ের রং যেন আলাদা লাল বর্ণের, তাই তিনি এদেরকে ডাকলেন Red Indians. আমেরিকান অধিবাসীরা এভাবেই রেড ইন্ডিয়ান নামটি পেল। দ্বীপের অধিবাসীরা নাবিকদের বেশ সম্মান জানাল। কলম্বাস তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন—দ্বীপের অধিবাসীদের কোনো ধর্ম নেই বলে মনে হচ্ছে তাই তাদের খুব সহজেই খ্রিস্টান করে নেওয়া যাবে। কলম্বাস যখন তাঁর দলবল, সেখানকার বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও রেড ইন্ডিয়ানসদের নিয়ে স্পেনে পৌঁছালেন, তখন রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলা তাদের আনন্দচিত্তে বরণ করলেন। এভাবেই ইউরোপের সাথে পশ্চিমের আরেকটি মহাদেশ আমেরিকার যোগসূত্র স্থাপিত হলো। East Indies আবিষ্কার করতে গিয়ে West Indies আবিষ্কার করে ফেললেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস।