দুজন লোক, দুই পা, একজোড়া জুতা

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২১, ২১:১৭

মূল :সামি সামির আলব্রিম

অনুবাদ :ফজল হাসান 

একটি ফিলিস্তিনি গল্প

ছয় ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার আমাদের ইউনিভার্সিটির লেকচার শেষে আমার বন্ধু মালিক এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা দুজনে গাজা সমুদ্রবন্দরে যাব। আমরা অলস ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকি এবং ফাঁকে কিছু ছবি তুলি।  পথের মাঝে বিভিন্ন ছেলে এবং কয়েকজন ফেরিওয়ালার সঙ্গে কথা বলি। আমরা যখন পোতাশ্রয়ে পৌঁছাই, তখন কাগজের ঠোঙায় সেদ্ধ ভুট্টা খাওয়ার ইচ্ছাটা আমার মধ্যে চাড়া দিয়ে ওঠে। মালিক অপেক্ষা করে এবং আমি ভুট্টা কিনতে যাই। আমি যেই ভুট্টা কেনা শেষ করেছি, তখনই আমার দৃষ্টি চলে যায় দুজন যুবকের দিকে। তাদের উভয়ের একটি করে পা এবং অন্য পা কেটে ফেলা হয়েছে। আমাকে থামতে এবং দেখতে বিশেষভাবে যা বাধ্য করেছিল, তা হলো তাদের দুজনের প্রায় অভিন্ন পোশাক এবং পায়ের জুতা।

আমি মালিককে বললাম, ‘ওদের কাহিনি জানতে চাই।’

আমি একজন কৌতূহলী এবং সামাজিক মানুষ। আমার এই বৈশিষ্ট্যের আংশিক কারণের জন্যই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান এবং গণমাধ্যম বিষয়ে পড়াশোনা করছি। আমরা যুবকদের দিকে এগিয়ে যাই এবং নিজেদের পরিচয় দেই। তারপর সিঁড়ি বেয়ে মাছ ধরার নৌকার পাশে নামার সময় তাদের সাহায্য করি, যেন তারা সেখানে দাঁড়িয়ে সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করে আনন্দ লাভ করতে পারে। তারা আমাকে যা বলেছে, তা হলো :

গাজা শহরের মাহমুদ হামামি প্রাচীন জাওয়া বাজারে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করে। তার বয়স উনিশ বছর।  যেই দিনটি তার জীবন বদলে দিয়েছে, সেদিন ছিল ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট। সেই দিন সে এবং তার বন্ধু আহমেদ আল-বোর্নো সীমান্ত বরাবর ‘গ্রেট রিটার্ন মার্চ’-এর বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার কথামতো তারা জোকার স্ট্রিটের কাছাকাছি, যা সীমান্ত থেকে তিন শ’ মিটার দূরে অবস্থিত, দাঁড়িয়ে শুধু বিক্ষোভকারীদের দেখছিল। তখন ইজরায়েলি চোরাগোপ্তা হামলাকারীরা মাহমুদের ডান পায়ে গুলি করে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারপর যখন সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তখন তার বাম পায়ে গুলি করে।  তাকে অজ্ঞান অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে তুলে গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

‘আমাকে শবদেহ সংরক্ষণ করার রেফ্রিজারেটরের মধ্যে রাখা হয়েছিল,’ সে বলল। ‘দু ঘণ্টার জন্য শহিদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল! ভাগ্যক্রমে ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমি তখনো বেঁচে ছিলাম।’

মাহমুদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। পরে তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য জেরুজালেমের মাকাসেড হাসপাতালে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। হাসপাতালে পঁচিশ দিন অবস্থানের সময় একপর্যায়ে সে অজ্ঞান অবস্থা থেকে জেগে ওঠে এবং উপলব্ধি করে যে, সে একা। তার সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য পরিবারের অন্য কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। একদিন পর তার বাম পা কেটে ফেলা হয়।

অবশেষে মাহমুদ যখন গাজায় ফিরে আসে, তখন তার পরিবারের সবাই স্বস্তি লাভ করে এবং খুশি হয়। কিন্তু এক পা নেই দেখে তারা মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পায়।  ঘটনা যা ঘটেছে, তা মেনে নিতে তাদের বেশ কিছুটা সময় লাগে। মাহমুদ নিজেও ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’-এ ভোগে।

‘কিন্তু আমার পরিবারের সমর্থন পেয়ে আমি ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। এখন আমার বন্ধু আহমেদের পালা। আমি স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে শুরু করেছি,’ মাহমুদ আমাকে আশ্বস্ত করে।

আহমেদের বয়স একুশ বছর। সে মাহমুদের প্রায় দুই মাস পরে একই ধরনের জীবন বদলানো মুহূর্তের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। মাহমুদ তাকে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে উত্সাহিত করেছিল। সীমান্ত বিক্ষোভের সময় দশ অক্টোবর (শুক্রবার) ইজরায়েলি চোরাগোপ্তা হামলাকারীরা আহমেদের ডান পায়ে গুলি করে।

‘আমি শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিতে ফিরতি মিছিলে গিয়েছিলাম এবং কোনো পাথরও নিক্ষেপ করিনি,’ সে স্মরণ করে। ‘আমি কখনোই ভাবিনি যে, আমাকে গুলি করবে। আমি দেখছিলাম সৈনিকেরা সীমান্তের কাছাকাছি তরুণদের নিশানা করে তাদের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে এবং একসময় তারা সেই অস্ত্রগুলো আমার দিকে ঘুরিয়ে দেয়।’

আহমেদ গাজার আল-শিফা হাসপাতালে ঊনত্রিশ দিন অবস্থান করে। যেহেতু গাজার হাসপাতালে ঔষধের সরবরাহ অপ্রতুল ছিল, তাই তার পরিবার সুচিকিত্সার জন্য তাকে গাজা থেকে অন্য কোথাও ভালো হাসপাতালে নিয়ে যেতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। যার ফলে মাহমুদের মতো আহমেদের ডান পায়ে জটিল সংক্রমণ দেখা দেয় এবং তার পা কেটে ফেলতে হয়  প্রথমে নিচের অংশ এবং পরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য হাঁটুর ওপর পর্যন্ত কেটে বাদ দিতে হয় ।

‘আমাকে অসংখ্যবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, যাতে আমি বেঁচে থাকতে পারি,’ আহমেদ বলল। ‘আমি আমার শরীরের একটা অঙ্গ হারিয়েছি এবং আমি প্রচণ্ড অভিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। সবকিছুই যেন দুঃস্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার মতো ছিল। কিন্তু এখন আমি আগের তুলনায় আরো বেশি শক্তিশালী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ মাহমুদ সব সময় তার পাশে থাকে। আরোগ্যলাভের জন্য সে তার বন্ধু ও পরিবারের লোকজনদের কৃতিত্ব দেয়।

এখন দুই যুবক একই কাপড় এবং জুতা পরে। সত্যি বলতে কি, যখন তারা জুতা কেনার কথা ভাবে, তখন তারা এক জোড়া জুতা কিনে এবং মূল্য ভাগাভাগি করে। মাহমুদ ডান পায়ে জুতা পরে এবং আহমদ পরে বাম পায়ে। তারা উভয়ই গাজা ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং বিশ্বভ্রমণের কথা ভাবে।

‘আমি তুরস্ক ভ্রমণের স্বপ্ন দেখি, যেখানে যুদ্ধ, মানসিক আঘাত বা সহিংসতা ছাড়াই নিরাপদ জীবন যাপন করা যায়,’ আহমেদ বলল।

তারা দুজনেই তাদের কাটা পা প্রতিস্থাপনের জন্য কৃত্রিম পা চায়।

 

[লেখক পরিচিতি : ফিলিস্তিনি তরুণ লেখক সামি সামির আলব্রিমের জন্ম গাজায় ১৯৯৫ সালে। তিনি গাজার আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান ও গণমাধ্যমে ব্যাচেলার ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতোমধ্যে তাঁর একাধিক গল্প ‘উই আর নট নাম্বার্স’ ওয়েবম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে।

গল্পসূত্র : গল্পটি লেখকের ইংরেজিতে ‘টু মেন, টু ফিট, ওয়ান পেয়্যার অব সুজ’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ‘উই আর নট নাম্বার্স’ ওয়েবম্যাগে ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে।]