রেজাউল করিম খোকন
করোনার সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যেটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। আর চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। অবশ্য করোনার এই সময়ে যে হারে ঘাটতি বাড়বে বলে আশঙ্কা ছিল, তেমন ঘটেনি। করোনার শুরুতে রপ্তানি যেমন কমে গিয়েছিল, অন্যদিকে আমদানিও ব্যাপক হারে কমে গিয়েছিল। তাতে কমে এসেছিল বাণিজ্য ঘাটতি। সম্প্রতি আবার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। বিদায়ী অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম ১১ মাস জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কম হয়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে দেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ডলার, এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৫ হাজার ৪২৩ কোটি ডলার। সে হিসাবে ১১ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ঘাটতির এই পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এই সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি আয় করেছে, বিপরীতে পণ্য আমদানি ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি চাহিদাও বেড়েছে। তাই আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তবে দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি কম হয়েছে। প্রথম ১১ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। বিমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। করোনার সময়ে মানুষ ভ্রমণ কম করেছে। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি কম হওয়ায় বিমার খরচও কমে গেছে। ফলে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে এ খাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২৩৪ কোটি ডলার। ঘাটতি কমেছে ৪ কোটি ডলার।
চলতি হিসাবে বিদেশ থেকে যে পরিমাণ মুদ্রা আসে এবং সেখান থেকে বিদেশে চলে যাওয়া অংশটুকু বাদ দিয়ে ব্যালান্স হিসাব করা হয়। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্স, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসহ (এফডিআই) অন্যান্য লেনদেন হিসাব-নিকাশ করে সার্বিক হিসাব প্রস্তুত করা হয়। গত মে মাস পর্যন্ত সার্বিক হিসাবে বাংলাদেশের ব্যালান্স ছিল ৮৫১ কোটি ডলার। গত বছরের মে মাসে এই ব্যালান্স ছিল ১৩৯ কোটি ডলার। মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব সরাসরি পড়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপরও। এফডিআই কমেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সরাসরি মোট যে বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে নিট এফডিআই বলা হয়। মহামারি করোনার মধ্যেই কয়েক মাস ধরে আমদানি ও রপ্তানি দুই-ই বাড়ছে। তবে আমদানি যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম হারে বাড়ছে রপ্তানি। এতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্যসমাপ্ত ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে ২৩ শতাংশ এবং চলতি মুদ্রানীতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। অর্থাত্, ১১ মাসেই পুরো অর্থবছরের বাণিজ্য ঘাটতির প্রাক্কলন ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় এবার পুরো অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে এই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
চলতি মুদ্রানীতিতে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাণিজ্য ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয় ১ হাজার ৮৩৯ কোটি ডলার। কিন্তু ১১ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রাক্কলনের চেয়ে ১৪৫ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে দেশ। মূলত রপ্তানির তুলনায় আমদানি অধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে বরাবরই বাণিজ্য ঘাটতি থাকে। কারণ রপ্তানির স্বার্থেই আমাদের দেশে আমদানির প্রয়োজনীয়তা বেশি। সাধারণত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়ে। আর চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত হলে বিদেশের সঙ্গে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করতে ঋণ নিতে হয়। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক অনুদান ও ঋণের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। গত ২৯ জুন প্রথমবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের নতুন মাইলফলক অতিক্রম করে।
বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি বাজারগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, চীন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, সুইডেন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর। এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলে দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানসহ সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে করণীয় নির্ধারণসহ পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রপ্তানি পণ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক রাখতে প্রণোদনা দিয়ে কাজ হবে না। সরকার পণ্য ও বাজারভিত্তিক একটি বিশ্লেষণ করে দেখতে পারে, এই মন্দা অবস্থার মধ্যেও রপ্তানি বাজারে কোন ধরনের পণ্য ভালো চলছে। তাহলে সেই ধরনের পণ্যের ওপর জোর দেওয়া দরকার, এ ছাড়া অন্য দেশগুলো কী জন্য এত ভালো করছে, সেটিও খুঁজে দেখা প্রয়োজন। যদিও তাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বেশি। সেগুলো আমরা করতে পারি কি না, চেষ্টা করে দেখতে হবে।
