ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের সুনাম নাই। কারখানা, গৃহস্থালি ও মেডিক্যাল বর্জ্য রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ফেলিয়া রাখা আমাদের স্বভাব হইয়া উঠিয়াছে। ঢাকা শহরে অন্তত ৩৭ শতাংশ বর্জ্য রাস্তাঘাটে ফেলিয়া রাখা হয়, যেইগুলি সংগ্রহ করা হয় তাহাও অধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে না। তদুপরি, সম্প্রতি যুক্ত হইয়াছে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক সামগ্রী বা ই-বর্জ্য। বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়িতেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ধারণা, দেশে গত বত্সর ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল চার লক্ষ মেট্রিক টন। এই ই-বর্জ্যের ৯০ শতাংশই নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আসিতেছে না। ২০৩০ সালে ইহার পরিমাণ ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ২০৩৫ সালে ৪৬ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছাইবে। এইসকল বর্জ্য গন্ধ ছড়ায় না, তাত্ক্ষণিকভাবে জনবিরক্তির কারণও হয় না, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ।

ডিজিটাল যুগের বিষাক্ত অবশেষ হইল ই-বর্জ্য। ই-বর্জ্য উত্পাদনে শীর্ষে রহিয়াছে চীন। গত বত্সর দেশটিতে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য উত্পাদিত হয়। ই-বর্জ্য উত্পাদনে শীর্ষ দেশগুলির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রহিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে আছে যথাক্রমে জাপান ও ভারত। আমাদের দেশেও ডিজিটাল ডিভাইস এবং যন্ত্রপাতির ব্যবহার দ্রুত হারে বাড়িতেছে। বাংলাদেশ এখন ইলেকট্রনিক পণ্য কেবল আমদানিই করিতেছে না, উত্পাদনও করিতেছে। প্রতি বত্সর প্রায় সাড়ে তিন কোটি মোবাইল হ্যান্ডসেট, ১ কোটি ৮০ লক্ষ ব্যাটারি, ১ কোটি ২০ লক্ষ চার্জার, ১০ লক্ষ কম্পিউটার এবং প্রায় ৪০ লক্ষ টিভি, ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর, ওভেন, এসি পরিত্যক্ত হইতেছে। এইগুলিই সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ভয়াবহ ক্ষতিকর ই-বর্জ্যে পরিণত হইতেছে। এইসকল ই-বর্জ্য পচনশীল না হওয়ায় ইহার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। ইহা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বর্জ্যের ভিতরে থাকে সীসা, মার্কারি, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ধরনের হেভি মেটাল— যাহা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ই-বর্জ্য সবচাইতে ক্ষতিকর শিশুস্বাস্থ্যের জন্য। বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বেই অটিস্টিক শিশুর জন্মহার বাড়িয়া যাইবার অন্যতম প্রধান কারণ অনিরাপদ ই-বর্জ্য।

তবে, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ক্ষতি কমাইয়া আনা সম্ভব। এইসকল বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসার সম্ভাবনাও প্রচুর। পরিবেশগত ও সম্পদের ব্যবহার বিবেচনায় এই রিসাইক্লিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ই-বর্জ্য পরিশোধন করিয়া কপার বা স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল ও বিকাশমান শিল্পনির্ভর অনেক দেশেই লাভজনক হইয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই কয়েকটি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি গড়িয়া উঠিয়াছে, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ই-বর্জ্য সংগ্রহ করা হইতেছে না। ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক এক সেমিনারে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বলিয়াছেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রহিয়াছে। ইহা আশার কথা বটে। আমরা বলিব, উন্নত দেশগুলিতে মোবাইল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানই বাতিল মোবাইল পুনরায় কিনিতে বাধ্য থাকে। বাংলাদেশেও এরকম ব্যবস্থা চালু করিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ লইতে হইবে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোরিয়া ও ভারত অনেক আগাইয়া গিয়াছে। আমরা তাহাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইতে পারি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কী পরিমাণ ই-বর্জ্য উত্পাদিত হইতেছে এবং এইসকল বর্জ্য কোথায় যাইতেছে, তাহা পর্যালোচনা ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দিবার ঘোষণা দিয়াছে জাতিসংঘের একাধিক সংস্থা। আমাদেরকে সেই সুযোগও লইতে হইবে।