‘সিরিয়া ও ইরাকে আইএস এখনো তত্পর রহিয়াছে। নিজেদের সকল পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসে উত্তর কোরিয়ার কোনো আগ্রহ নাই। আর ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানাইবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছে, সেই চুক্তি তাহারা অক্ষরে অক্ষরে মানিয়া চলিতেছে।’ বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি লইয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানেরা সমপ্রতি এই মূল্যায়ন উপস্থাপন করিয়াছেন। আর তাহাদের এই মূল্যায়নে বেজায় খেপিয়াছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প কিছুদিন পূর্বেই ঘোষণা করিয়াছিলেন যে, সিরিয়ায় আইএস পরাজিত হইয়াছে। উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে বলিয়াছেন যে, দেশটির নেতা কিম জং-উন প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন—তাহার দেশের সকল পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করিবেন। অন্যদিকে ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্প দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাইয়াছেন যে, গোপনে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বানাইতেছে ইরান।
দেখা যাইতেছে যে, ট্রাম্প যাহা বারংবার বলিতেছেন, তাহার দেশের গোয়েন্দাপ্রধানেরা কংগ্রেসের শুনানিতে বলিলেন ঠিক উল্টো কথা! তাহাতে ট্রাম্প না চটিয়া তিষ্ঠাইবেন কী করিয়া? ট্রাম্প এতটাই ক্ষিপ্ত হইয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সকল গোয়েন্দাকে ‘পুনরায় স্কুলে ফিরিয়া যাওয়া উচিত’ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। ইহা অবশ্য নূতন কথা নহে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংস্থার মুখে ট্রাম্প মূর্খতার তকমা দাগাইয়াছেন। ট্রাম্প মনে করেন যে, তিনি সকল ব্যাপারেই অন্য সকলের চাইতে বেশি জানেন। গোয়েন্দাদের বিষয়ে তিনি এই কারণেও বিরক্ত যে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাশিয়ার প্রভাবের ব্যাপারে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তদন্ত চলিতেছে। তবে ইরানের ব্যাপারে তাহার অবস্থান যেন—‘যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা।’ ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরান পরমাণু চুক্তির (ইনারা) আওতায় ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হইবার পর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয় এবং ইরানকে কিছু আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ইরান ও ছয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাক্ষরিত এই পরমাণু চুক্তির বিষয়ে বরাবরই ঘোর বিরোধী ছিলেন ট্রাম্প। গত বত্সর মে মাসে তিনি এই চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন। তবে এই চুক্তি হইতে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়া আসিবার পরও ইউরোপের পক্ষ হইতে এই চুক্তি বজায় রাখিবার জন্য ইরানকে আহ্বান জানানো হয়।
ইশপের গল্পে আমরা দেখিতে পাই একটি হরিণছানাকে শিকার করিবার জন্য সিংহের হাস্যকর অজুহাত। একটি হরিণছানা ভাটিতে জলপান করিবার সময় উজানে দাঁড়াইয়া সিংহ হুঙ্কার ছাড়ে যে, পুঁচকে হরিণ তাহার জল ঘোলা করিতেছে! হরিণছানা যখন জানাইল যে, সে জলাধারের নীচের দিকে— আর স্রোত আসিতেছে সিংহের নিকট হইতেই, তখন সিংহ বলিল, হরিণছানা নিশ্চয়ই গত বত্সর তাহার জল ঘোলা করিয়াছিল। হরিণ জানাইল তাহার বয়স মাত্র ছয় মাস। সিংহের আর তর সহে না, বলিল, তুই জল ঘোলা করিস নাই, তোর মা নিশ্চয়ই ইহার আগে জল ঘোলা করিয়াছিল, সুতরাং সেই অপরাধে তোকে আমি খাইব। ইশপের এই গল্পের মতোই মনুষ্যসমাজেও দেখা যায় যে, ছোটকে আক্রমণ করিবার ইচ্ছাই শেষ কথা, অজুহাত একখানি দাঁড় করাইয়া লইলেই হইল। ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও ইহার ভূরি ভূরি প্রমাণ দেখিতে পাওয়া যায়।
