চলমান শিক্ষাসংকট নিয়ে শিক্ষকদের ভাবনা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ২০:০৯

 

করোনা মহামারি প্রথম শনাক্ত হয় ২ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে। আর বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। ফলে মার্চ ২০২০ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ ধাপে চলমান ছুটি বৃদ্ধি করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। করোনার কবলে যেমন নাজেহাল শিক্ষাব্যবস্থা তেমনি শিক্ষার্থীরাও অনিশ্চয়তা, সেশনজট ও ক্যারিয়ার চিন্তায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এমন অবস্থায় শিক্ষা বিমুখ হয়ে পড়ছে সম্ভাবনাময় অসংখ্য শিক্ষার্থী, যা একটি জাতির জন্য ধ্বংসের আগাম বার্তা। চলমান এই শিক্ষাসংকট নিরসনে কী ভাবছেন আমাদের শিক্ষকরা? এই বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতামত তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী— নাঈমা আক্তার রিতা

বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরীক্ষার জন্য অনলাইনভিত্তিক পদ্ধতি চালু

—অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন

চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা মহামারি খুব দ্রুতই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার নয়। তাই স্বাভাবিক জনজীবন বহমান রাখতে, একে সঙ্গে নিয়েই চলার পথ খুঁজতে হবে। করোনার প্রথম ধাপের পর অফিস-আদালত, কলকারখানা,  গণপরিবহন, হাটবাজারসহ দেশের সর্বস্তরের কার্যক্রমে স্বাভাবিক গতি এলেও খোলা সম্ভব হয়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

তবে চলমান শিক্ষাসংকট দূরীকরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে। ফেরত দেওয়ার শর্তসাপেক্ষে ৮ হাজার টাকা লোনে তেমন সাড়া দেয়নি অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীরা, তাদেরকে শর্তহীনভাবে শিক্ষা উপকরণ অনুদান দিতে হবে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদেরকে পর্যাপ্ত শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে প্রয়োজনবোধে পরীক্ষাপদ্ধতি ও সিলেবাসে সংস্কার এনে অনলাইন ভিত্তিক পরীক্ষা শুরু করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে থিওরিটিক্যাল কমিয়ে, মৌখিক পরীক্ষা ও এসাইনমেন্ট বা প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি

—ড. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হুসাইন

অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আমাদের আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবন থেকে মহামূল্যবান সময় বিনষ্ট হচ্ছে। এখনই  জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সমাধানে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম—ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে শিক্ষক ও  শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। অনলাইন ক্লাস, ই-লাইব্রেরি বা বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিনামূল্যে অথবা সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিগুলো মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে। সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। বেসরকারি ও নন-এমপিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকসমাজকে সরকারি অনুদান দিয়ে সহায়তা করা দরকার। শিক্ষাপ্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনা করে সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে চালু না করে ধাপে ধাপে এবং ওপরের শ্রেণির কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে খুলে দিতে পারে।

বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ

করতে হবে

—সৈয়দ আশিক-ই-ইলাহী

সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনার কারনে শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা দেয় নানাবিধ সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমরাও পাঠদানের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদেরকে শতভাগ অনলাইন ক্লাসমুখী করা। মফস্বলের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে এসেছে। সঙ্গত কারণেই তাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাসে ব্যবহার উপযোগী ডিজিটাল ডিভাইস কেনার সামর্থ্য নেই। উপরন্তু পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করাও তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে অনলাইন ক্লাস বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ছাত্রছাত্রী নিয়মিত ক্লাস করতে পারছে। বর্তমান বাস্তবতায় চলমান শিক্ষাসংকট নিরসনে আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যাতে করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট সেবা বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়।