ভারতবর্ষের স্বাধীনতালাভে পাকিস্তান খণ্ডিতরূপে দুইভাগে বিভক্ত হইল ও আমরা ইহার আধিবাসীরূপে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য দ্বারা ইহাকে সর্বপ্রকার উন্নতি ও শান্তির পথে বিশ্ববাসীর সম্মুখে আদর্শনীয় রাষ্ট্ররূপে গড়িয়া তুলিব; ইহাই হইবে আমাদের প্রধান কর্তব্য, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সংগঠন, উন্নতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেকটি দেশবাসীর আন্তরিক প্রচেষ্টাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন এবং রাষ্ট্র নায়কগণকে এমনভাবেই সকল দিক বিবেচনা করিতে হইবে যাহাতে প্রত্যেকটি কার্যে দেশবাসীর পূর্ণ সমর্থন থাকে, তত্প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে। আইনকানুন প্রণয়নে সবদিকে লক্ষ্য রাখা যেমন প্রয়োজন, তদাপেক্ষা বেশি প্রয়োজন দেশবাসীর সববিষয়ে সহজ ও সরলভাবে জীবনযাপনের ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের সর্ব কার্যের সাথে সব শ্রেণির তেমনি সরল ও সহজভাবে সহযোগিতায় ভাবের আদান-প্রদান।
রাষ্ট্রভাষাই এক্ষেত্রে এই সকল প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করার প্রধান সহায়ক হইবে। পূর্ব পাকিস্তানবাসী সর্ব শ্রেণির লোকেরই মাতৃভাষা বাংলা এবং সর্ব প্রকার ব্যবহারিকভাবে বাংলা ভাষাই এদেশের প্রত্যেকটি লোকের আজীবনের সম্বল। সুতরাং এদেশের সর্ব কার্যেই সাধারণতঃ বাংলা ভাষার ব্যবহার না থাকিলে কোন প্রকারেই দেশবাসীর সঙ্গে সহজ ও সরলভাবে ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব হইতে পারে না। শুনিতেছি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা হইবে। অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ স্থলেই উর্দু ভাষা প্রচলন, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি হাজারের মধ্যে দুইজন মুসলমান এবং একজন হিন্দুও উর্দুভাষা সামান্য রূপে জানেন কিনা সন্দেহ। নতুন ভাবে ইহা শিখিয়া লইতে কয়েক বত্সর সময়ের দরকার। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত ও কতক অর্ধশিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত লোকের সংখ্যা খুবই কম।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রভাষা সম্পূর্ণ নতুন হইলে দেশের প্রত্যেকটি লোকই সেক্ষেত্রে অশিক্ষিত বলিয়া গণ্য হইবে, বিশেষতঃ সর্ব প্রকার কার্যেই প্রত্যেকটি লোকের বিশেষভাবে অসুবিধার সৃষ্টি হইবে। তদুপরি এই সকল ভাষাগত অশিক্ষার দরূন উপযুক্ত ব্যক্তির পক্ষেও চাকুরী এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব হইবে। রাষ্ট্রভাষা উর্দুর সাথে সামঞ্জস্য রাখিতে হইলে রাজকার্য ও ব্যবসাদির ব্যাপারে বাংলা ভাষায় অনভিজ্ঞ অবাঙালি ছাড়া আর কোন উপায় থাকিবে না। ইহাতে উভয় পক্ষই নানারূপে অসুবিধার সৃষ্টি হইয়া কাজ কর্মের শৃঙ্খলা ব্যাহত হবার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। বিশেষতঃ এই সকল অসুবিধায় পড়িয়া রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে দেশবাসীর আন্তরিকতার যে অভাব ঘটিবে, ইহা নিতান্তই অবাঞ্ছনীয়। কাজেই রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে রাষ্ট্রনায়ক মহোদয়গণকে এ বিষয়ে সর্বদিক বিবেচনা ও লক্ষ্য করিয়া দেখিবার জন্য আমরা সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাইতেছি এবং বাংলা ভাষাকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে প্রার্থনা করিতেছি।
সংগ্রহ ও গ্রন্থনা : দীপংকর চন্দ
