আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য খালাসে বেনাপোলে দীর্ঘসূত্রতা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২১, ২১:২৩

আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর অফিস

‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’ পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রিতায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য খালাসে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশ থেকে আনা খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ঐ পরীক্ষাটির বাধ্যবাধকতা শিথিলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বেনাপোল শুল্ক কর্তৃপক্ষ তা আমলে না নেওয়ায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল পরীক্ষাটি করাতে গিয়ে আমদানিকারকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই সুযোগে চোরাইপথে খাদ্যপণ্য ঢুকছে বাজারে। টেস্টবিহীন সেসব খাদ্যপণ্য সরাসরি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটি বন্ধে আমদানিকারকরা বিসিএসআই এবং বিএসটিআইর বাজার তদারকির দাবি জানিয়েছেন।   

সূত্র জানায়, ‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’ সার্টিফিকেট পেতে হলে ‘বিসিএসআইআর’ থেকে পরীক্ষা করাতে হয়। এই পরীক্ষা করানোর জন্য বেনাপোল বন্দরে প্রতিষ্ঠানটির কোনো শাখা অফিস নেই। পরীক্ষার জন্য পণ্যের নমুনা ঢাকাস্থ বাংলাদেশ শিল্প ও গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পাঠাতে হয়। আমদানিকারকরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের এই পরীক্ষাটি করাতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। পাশাপাশি এটি অনেক সময়সাপেক্ষও। এতে ৫০ হাজার থেকে  ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এই সময়ে পণ্যটি গুদামে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুদামজাত পণ্য অনেক সময় ইঁদুরে নষ্ট করে। পাশাপাশি পণ্যের ‘লাইফ টাইম’ বা আয়ুষ্কাল কমতে থাকে। আটকে থাকে বিনিয়োগও। অথচ আমদানি নীতি অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশ থেকে খাদ্যপণ্য আনা হলে তা মানুষের খাওয়ার উপযোগী কি না সেটি পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ও অনুমোদিত সংস্থা থেকে খাদ্যপণ্য বা খাদ্যশস্য মানুষের খাওয়ার উপযোগী এমন সনদপত্র থাকতে হয়। আমদানি দলিলাদির সঙ্গে থাকা সার্টিফিকেট শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও সংগনিরোধ কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা লাগে।  

আমদানিকারকরা বলছেন, আমদানি নীতিমালায় সার্কভুক্ত দেশের খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা শিথিল বা অব্যাহতিযোগ্য বলা হয়েছে। আমদানি নীতি আদেশ (২০১৫-২০১৮র পৃষ্ঠা ১৩৩৫র অনুচ্ছেদ ১৬) মতে, সার্কভুক্ত দেশ থেকে আমদানি হলে এবং তা ‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’ সার্টিফিকেট থাকলে রেডিয়েশনের মতো সর্বোচ্চ টেস্ট থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আমদানি করা খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্যের মান ও গুণাগুণ মানুষের খাওয়ার উপযোগীসহ সর্বপ্রকার জীবাণুমুক্ত এমন সার্টিফিকেট থাকতে হবে। আর তা হতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ও অনুমোদিত সংস্থার। কিন্তু এই নীতিরই আরেকটি অনুচ্ছেদ ২৫র (১৩৩৭ পৃষ্ঠা) কারণে অব্যাহতির বিষয়টি ব্যাহত হচ্ছে। ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’ যাচাইয়ের জন্য বিসিএসআইআরের কাছ থেকে টেস্ট করাতে হবে। ফলে রপ্তানিকারক দেশের কর্তৃপক্ষের সার্টিফিকেট থাকার পরও পুনরায় পরীক্ষা করতে হচ্ছে।

ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মতিয়ার রহমান জানান, বেনাপোল বন্দরে আরো গতিশীলতা আনার জন্য নীতিমালায় কিছুটা সংশোধন আনতে হবে। তিনি মনে করেন, নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ থেকে ব্যবসায়ীদের অব্যাহতি দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যদি ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, আমদানি নীতিমালার ১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রপ্তানিকারক দেশ হতে ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হলে ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পুনরায় ঐ পরীক্ষা করানোর দরকার নেই তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে সোমবার বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার আজিজুর রহমান মোবাইলে ইত্তেফাককে জানান, আমদানিকারকদের খাদ্যপণ্য এক থেকে দেড় মাস পণ্যগারে পড়ে থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, এটা ঠিক। তবে আমদানি নীতি আদেশের (২০১৫-২০১৮) ১৩৩৫র অনুচ্ছেদ ২৫ অনুসারে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’ যাচাইয়ের জন্য বিসিএসআইআরের কাছ থেকে টেস্ট করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত ছাড় করানোর অনুমোদন দেওয়া যায় না। তবে পরীক্ষার রিপোর্ট পাবার সময় কমিয়ে আনার ব্যাপারে ১১ জুলাই বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি দুই-এক দিনের মধ্যে ব্যবসায়ী ও আমাদের সঙ্গে জুম মিটিং করবেন। এক্ষেত্রে সাময়িক রিপোর্ট প্রদান করে পণ্য ছাড়ের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করব আমরা। আমদানিকারকরা পণ্য ছাড় করিয়ে তাদের গোডাউনে রাখতে এবং চূড়ান্ত রিপোর্ট পাবার পরই বাজারজাত করতে পারবেন—এমন নিয়ম প্রণয়নের কথা ভাবা যেতে পারে।