ভাষা নিয়ে কী ভাবছেন তরুণরা

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৮

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই ভাষা সংগ্রামীদের, যাদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল

বায়ান্নর রাজপথ। তাই এই মাস বাঙালি জাতির কাছে বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে একটি প্রেরণা। এখনও একুশ শেখায়  কারো কাছে

মাথা নত না করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং আত্মমর্যাদাশীলতা। বায়ান্নর সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়ই শক্তি পায় বাঙালি জাতি তথা এদেশের তরুণরা। এ দেশের শক্তি হচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। মহান এ ভাষা আন্দোলনের মাসে তরুণ প্রজন্মের ভাবনা ও

প্রত্যাশা নিয়ে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরেছেন মোঃ জাহিদুল ইসলাম

আমরা জানি, একুশের চেতনাকে ধারণ করেই ছেষট্টি, ঊনসত্তর ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি লড়াই করেছে। আর সে লড়াইয়ে বিজয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। তারপরও ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মত্যাগের চেতনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এখনও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনিক, শিক্ষাক্ষেত্রে ও পেশাগত জীবনে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমাদের সংকীর্ণতা ও উদাসীনতা রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে বাংলা ভাষায় বিদেশি ভাষার বিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃভাষা বাংলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে একুশের চেতনা চির জাগ্রত হবে।

—আলী ইউনুস হূদয়

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঐতিহাসিক স্থাপনা, নিদর্শন, ভ্রমণব্যবস্থা সব দেশেই কমবেশি আছে কিন্তু যখন ‘আমরা এমন এক জাতি যারা ভাষার জন্য নিজেদের জীবন দিয়েছি’ বলতাম তখন সবার চোখ-মুখের ভাষা দেখে মনে হয়েছে, এ কিভাবে সম্ভব? কতোটা নিবেদিত জাতি হলে এ কাজ করা যায়? কলকাতাতে বেশিরভাগ মানুষই এখন বাংলার চেয়ে হিন্দিতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কথাপ্রসঙ্গে একজন বলে ফেললেন, দাদা, আপনাদের অনেক ভালো লাগে। বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন আপনারাই। বর্তমান তরুণ সমাজের প্রতি আমার এটুকুই প্রশ্ন, সত্যিই কি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারছি?

—মেহেদী কবীর

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ভাষা চর্চার অন্যতম কয়েকটি মাধ্যমের মধ্যে গান, চলচিত্র, বিজ্ঞাপন অন্যতম। যা অতি সহজেই জনসাধারণের নিকট পৌঁছতে পারে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের ভাষাতেও এর প্রভাব বিস্তার করে দারুণভাবে। কেউ কেউ বাংলা ভাষাতে বিকৃত, মিশ্র ও অশুদ্ধ উচ্চারণের প্রয়োগ ঘটিয়ে সাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যা এক পর্যায়ে বাংলাকে বিশাক্ত করে ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতেও বাংলা ভাষার সম্মান, ব্যবহার বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে তরুণরাই। অভ্র কিবোর্ডে, পিপিলিকা ছাড়াও আধুনিক প্রযুক্তিতে বাংলার স্বকিয়তা রক্ষায় কাজ করে চলছে।

—নাজমুস সাকিব সাদি

ফলিত গণিত বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

পৃথিবীতে এমন নজির আর কোথাও নাই, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা। এই চেতনা যেন কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই খালি পায় প্রভাতফেরির সাথে জেগে ওঠে আর স্ট্যাটাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যেখানে তরুণেরা দেশের অগ্রপথিক, সেখানে  সেই আলোকবর্তিকারা ঠিক কতখানি শ্রদ্ধাশীল  এই বাংলা ভাষার প্রতি, আজ বড় প্রশ্নের জায়গা হয়ে ওঠেছে। ভগ্ন থেকে ভগ্নিত বাংলা ভাষার করুণ রূপ কোনো ভাবেই প্রত্যাশিত নয়।  যে ভাষা রক্ত দিয়ে অর্জিত সে ভাষার স্থান তাজে, বুকে, চেতনায় তাকে আর কোথাও মানায় না। শুধু ভাষার মাসে নয় সারাবছর এই চেতনায়          বুক বেধে বাঙালি তরুণেরা গর্জে ওঠুক।

—জান্নাতুল ফেরদৌস

ইংরেজি বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই ফেব্রুয়ারি-ই ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। বস্তুত ফেব্রুয়ারি মাস একদিকে শোকাবহ হলেও অন্যদিকে আছে এর গৌরবোজ্জ্বল দিক। কারণ, পৃথিবীর একমাত্র জাতি বাঙালি, যারা ভাষার জন্য এ মাসে জীবন দিয়েছিল। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাসের সর্ববৃহত্ কর্মযজ্ঞ হলো বইমেলা। তাই সবারই দরকার নিজেদের বই পড়া এবং বই উপহার দেয়া।

—তাহরিমা তাহসিন লিমা

রসায়ন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

দুঃখজনক হলেও সত্য যে একুশের চেতনা           এবং বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। তাই ভাষার মাসে চাই জাতীয় জীবনের সর্বস্তরের বাংলা ভাষার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, এর সাংবিধানিক বাস্তবায়ন। অর্থাত্ উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার যথাযথ ও   নির্ভুল ব্যবহার। চাই গণমাধ্যমে, বিশেষ করে বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহার। ইংরেজী-বাংলার মিশ্রণে দোআঁশলা  কথকতার বিকৃত উপস্থাপন নয়। এফএম রেডিওতে প্রচারিত ইংরেজী বাংলার মিশ্রণ যা তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করছে, বিভ্রান্ত করছে। চাই এ জাতীয়  অনাচার বন্ধ হোক।

—মোসফেকুন নাহার (মিতু)

পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।