বড় ঝুঁকিটা নেন ভারত জয়ের মাধ্যমে। পরিকল্পনা ছিলো ছয় থেকে আটজনের একটা টিম নিয়ে সফরে যাবেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। সাক্ষী হবেন বিখ্যাত ও দর্শনী স্থানসমূহের। তা ভেস্তে যাওয়ার পরেও তিনি হাল ছাড়েননি। একমাত্র অনুজ মারুফ আজাদকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ভারত জয়ের
মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
সাবিতা বিনতে আজাদ শিফা। শিফা নামেই অধিক পরিচিত তার। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগের স্নাতক সমাপনী সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি আরো বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত আছেন শিফা। ভালোবাসেন দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে। ডিবেট করতে। এছাড়া সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে সহযোগিতা করাও তার ইচ্ছে।
শিফার বাড়ি গাজীপুরের জয়দেবপুরে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সোহরাত বেগম মনিকা এবং অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদের শিফা প্রথম সন্তান। শিফার বেড়ে ওঠা গাজীপুর শহরে। জয়দেবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কলেজে থাকার সময়ই তিনি গাজীপুর কলেজ ডিবেট ফোরাম এবং গাজীপুর জেলা ডিবেট দলের সদস্য হন।
শিফা প্রথমে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। সমাজের মানুষের সঙ্গে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে থেকে পরবর্তীতে ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগে। এ সময়ে শিফা নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অসহায় পথচারী এতিম বাচ্চাদের পুনর্বাসনের সংগঠন ‘লিডোর’ সঙ্গে কাজ করেন। স্বেচ্ছায় রক্তদান সংস্থা বলাকার নির্বাহী সদস্যও তিনি। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব ‘টোস্টমাস্টার ঢাকা ক্লাবের’ সদস্য তিনি। এর মাধ্যমে শিফা একাধিক ক্লাবে নবীন সদস্যদের মাঝে স্পিস দেয়া রপ্ত করতে শিখেন। ইংলিশে বরাবরই ভালো এ শিক্ষার্থী ইংলিশ শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন।
ভ্রমণপিপাসু শিফার যাত্রাটা শুরু হয় দেশের ভিতরেই। সিলেটের হাওর-বাঁওড় ও পাহার-পর্বত বেয়ে বেড়ান ২০১৬ সালে। এরপরে শিফা বড় ঝুঁকিটা নেন ভারত জয়ের মাধ্যমে। পরিকল্পনা ছিলো ছয় থেকে আটজনের একটা টিম নিয়ে সফরে যাবেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। সাক্ষী হবেন বিখ্যাত ও দর্শনী স্থানসমূহের। তা ভেস্তে যাওয়ার পরেও তিনি হাল ছাড়েননি। একমাত্র অনুজ মারুফ আজাদকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ভারত জয়ের। লক্ষ্যে অবিচল মেয়েটি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে যাত্রা শুরু করেন ভারত রপ্তে। কলকাতার পথঘাট ও বিভিন্ন বিখ্যাত স্থান ঘুরে ট্রেন পথে আগ্রায় পৌঁছান। যমুনা নদীর তীরে শাহজাহানের প্রেমের নিদর্শন তাজমহলের স্থাপত্য শিল্প ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি সেখানে অবস্থিত ফতেহপুর সিকরি, পৃথিবীর সর্ববৃহত্ বুলান্দ দরজা, পাঁচবিবির মাজার, জলমহাল ও যোদ্ধা ভাইয়ের ঘরে নিজেদের ছায়া ফেলেন।
আগ্রার পর্ব শেষ করে চলে যান ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। দিল্লির বিখ্যাত কুতুব মিনার, জামে মসজিদ, চাঁদনিচক, পালিকা বাজার, আকবরের সিংহাসন ঘুরে মেট্রোর পথ ধরে চলে যান রেড ফোর্টে। সেখান থেকে রাতের বাসে চন্ডিগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। শিফা সব থেকে বেশি আনন্দ উপভোগ করেন ভারতের মানালিতে।
মানালির বিয়াস নদী, হিম ভ্যালি পাহাড়, হাডিপ্পার মন্দির চড়িয়ে বেড়ান। তাছাড়া প্যারা প্লাইডিং, বরফে স্কিং, জিপে চড়ে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়, ক্যাবল কারে উড়ে বেড়ানোর সখ পূর্ণ করেন। দীর্ঘ ১৫ দিনের ভারত সফর শেষ করে ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ দেশে ফিরেন।
পরবর্তীতে শিফা আবারও ভারতে যায়। তবে এবার গবেষণার কাজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সোসাইটির প্রতিনিধি হয়ে মেঘালয়ের নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটি তার উদ্দেশ্য। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ১০ দিনের একটি ওয়ার্কশপ ও সেমিনারে অংশ নেন। ভিন্ন রুটে যাত্রা হলেও শিফা তার পুরনো অভিজ্ঞতা নিয়ে পুরো টিমের নেতৃত্ব দেন। রিসার্চ শেষে মেঘালয়ের বিভিন্ন পাহাড় পর্বত ঘুরে দেখেন। সেখান থেকে গোহাটি, আসাম, আবারো কলকাতা ঘুরে দেশে ফিরেন। সর্বশেষ শিফা গতবছর ডিসেম্বরে নিজ বিভাগের শিক্ষা সফরে পাড়ি দেন মেঘ আর সমুদ্রের রাজ্য চট্টগ্রামে। ১০ দিনের এ সফরে এবারও ব্যাচের নেতৃত্ব তার উপরে। ঘুরে আসেন খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি, আলুটিলা গুহা, বান্দরবন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, স্বপ্নের সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ ও দেশের সর্বশেষ ভূখণ্ড ছেড়াদ্বীপে। এখানে শিফার নতুন উপলব্ধি দেশের মধ্যে তার দেখা সব থেকে সুন্দরতম স্থানটির নাম হলো সমুদ্রটিলা হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপ।
শিফার দাবি অধম্য সাহস আর প্রবল ইচ্ছে থাকলে দেশ কিংবা দেশের বাইরে মেয়েরাও সীমানা পেড়িয়ে বেড়াতে পারেন তিনিই তার উদাহরণ। এজন্য দরকার পরিবারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা। পরিবারের সাথে থাকলে আমাদের মেয়েরাও যে সকল বাধা অতিক্রম করতে পারে তিনি তার উদাহরণ। অবশ্য এজন্য পরিকল্পনামাফিক আগাতে হবে, টাকাও জমাতে হবে। তার লক্ষ্য পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য রপ্ত করা। এছাড়াও দর্শনীয় স্থানের দর্শক হওয়া।
