শুক্র-শনিবার সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস থাকে বন্ধ। এই সুযোগে অডিটোরিয়ামের বারান্দায় ‘পাঠশালা ২১’-এর শিক্ষা কার্যক্রম চলে। এই দুদিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কলকাকলিতে অডিটোরিয়াম এলাকা জমজমাট হয়ে ওঠে। যারা কোনো দিন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি, তারাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আনন্দ উপভোগ করে লেখাপড়ার ফাঁকে। সর্বোচ্চ এক বিদ্যাপীঠের ভিতরে যেন আরেক বিদ্যালয়। যদিও এর স্বীকৃতি আর দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি গত ৭ বছরে সমাজকে আলোকিত করার কঠিন ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
‘স্বপ্নরথে আলোর পথে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সিলেটে চলছে এক ভিন্ন শিক্ষাকার্যক্রম। দিনে দিনে বেড়ে চলছে এই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—এরকম একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার স্বপ্নও দেখছে।
বর্তমানে স্কুুলটিতে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিশু শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগেরই আবাস সিকৃবি ক্যাম্পাসের আশপাশে। শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে অধ্যয়নরত ও সংগঠনটির ৫০ জন শিক্ষার্থী।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পাঠশালার সদস্যরা সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ, শীতবস্ত্র, ঈদবস্ত্র বিতরণসহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। পাঠশালা ২১-এর বর্তমান সভাপতি শামীম রেজা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের আর্থিক সহযোগিতায় এই সকল সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মূলত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধেই সংগঠনটি কাজ করছে। ৭ বছরে পথ চলায় পাঠশালা ২১ তৈরি করেছে অনেক মেধাবী মুখ। পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় তাদের শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। এদেরই একজন মেধাবী মুখ স্বপ্না। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত জেএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে স্বপ্নার পরিবারের পক্ষে আর তার পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তখনই এগিয়ে আসে পাঠশালা ২১। স্বপ্নার মলিন চোখের ঝলমলে স্বপ্নকে সার্থক করতে তাকে সিলেট মডেল স্কুুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে সে এখন সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েই সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে পাঠশালা ২১-এর কার্যক্রম। ২০১২ সালে কৃষি অনুষদের পঞ্চম ব্যাচের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংগঠন।
পাঠশালা ২১-এর উপদেষ্টা সহযোগী প্রফেসর ড. ফুয়াদ মণ্ডল জানান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ঠিকঠাকমতো হচ্ছে কি না তা জানার জন্য নিয়মিত হোম ভিজিট করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাঠশালা ২১-এর মাধ্যমে আরও মেধাবী মুখ তৈরি করা যাবে।’ সিকৃবির রেজিস্ট্রার মো. বদরুল ইসলাম শোয়েব বলেন, ‘সিকৃবি শিক্ষার্থীদের একটি মহতী উদ্যোগ পাঠশালা-২১।’ সকলের সহযোগিতায় পাঠশালা ২১ আলোর পথের কাণ্ডারী হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন তিনি।
