কান চলচ্চিত্র উৎসবে অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া সংবাদকর্মীদের জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে শাটল ভাউচার থাকে। উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যার যার অ্যাকাউন্ট থেকে সেটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে আসতে হয়। উৎসব শুরুর আগের দুই দিন এবং উদ্বোধনী ও পরদিন নিস কোত দা’জুর থেকে এই সুবিধা পাওয়া যায়। এবারের আসর শুরু হয়েছে ৬ জুলাই। সুতরাং ৪ জুলাই থেকে পাওয়া যাবে ভাউচারটি। কিন্তু ১০ দিন কোয়ারেন্টিন করতে হবে বলে আগেভা চলে আসায় সেই সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই।
নিস বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে কান গেলে ৮০-৯০ ইউরো গুনতে হবে। তার চেয়ে বাস ঢের ভালো। ২২ ইউরোতে টিকিট কেটেছি। ফরাসি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল আল্পস-মারিটিম বিভাগের মূল শহর নিস থেকে কান যাচ্ছি। দু’পাশে উঁচু-নিচু পাহাড়, সড়কের ধারে গাছগাছালি, দূরে সমুদ্রের হাতছানি। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে চোখ শুধু জুড়িয়ে যায় না, আটকে থাকতে চায় চোখ। বাস চলছে। একটার পর একটা অপরূপ দৃশ্য ধরা দিচ্ছে। ২০ ঘণ্টার ট্রানজিটের ধকলেই কিনা, প্রকৃতি দেখতে দেখতে চোখ বুজে এসেছিলো।

কানে পৌঁছাতে আধাঘণ্টার বেশি লাগলো না। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, দুই মিনিটের জন্য হলেও রূপবতী কানসৈকতকে একনজর দেখে আসবো। ১০ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষের আগে সেই সুযোগ আর পাবো না। তাছাড়া ফরাসি সৌরভ যে সেখানেই!

কানে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁর অভাব নেই। যে গলি দিয়েই হাঁটি, খাবারের টেবিল সাজানো। সৌন্দর্য প্রসাধনী, পোশাক, বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান তো আছেই। কান বাসস্ট্যান্ড থেকে যেকোনো গলি দিয়ে সাগরপাড়ের দিকে এগোলে এসব চোখে পড়ে। এঝাড়া কানের যেদিকেই তাকাই পাম গাছ দেখি। এখানকার চেনা নিদর্শন এই বৃক্ষ।

কানের ম্যাচি সৈকতে সূর্যস্নানে ব্যস্ত বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। তরুণ-তরুণীরাই বেশি। যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জলরাশি। আকাশের সব নীল যেন মিশে আছে সমুদ্রজলে। আহা কী রূপবতী! সাগরের জলে কিছুক্ষণ মন ভিজিয়ে দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি কাটানো গেলে ভালোই হতো। খুব নামতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। কিন্তু হাতে লাগেজ, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। দক্ষিণ ফরাসি উপকূলীয় সৌন্দর্যের তুলনা হয় না।

দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে বেশিক্ষণ থাকিনি সৈকতে। পরে ভালো করে উপভোগ করা যাবে ভেবে ট্রেন স্টেশনে ফিরলাম। এখানে গাড়ি নিয়ে এলেন সেজান ভাই। পেছনের আসনে তার সহধর্মিণী ও একমাত্র কন্যা মিমোজা। বয়স ১৫ মাস। ফরাসি একটি ফুলের নাম ‘মিমোজা’। মেয়ের নাম এটি রাখার কারণ কী? গাড়ি চালাতে চালাতে সেই গল্পটা বললেন সেজান ভাই। মিমোজা তার প্রিয় ফুল। কিন্তু মিমোজাকে স্পর্শ করতে পারেন না তিনি। অ্যালার্জিজনিত কারণে এই ফুলের কাছে গেলেই চোখ-মুখ ফুলে যায় তার। তাই মেয়ের নাম মিমোজা রেখেছেন, যাতে তাকে স্পর্শ করতে পারেন। অবাক হয়ে গেলাম শুনে। জীবন কখনো কখনো গল্পের মতো লাগে!

কান থেকে ১৫ মিনিটে মোজা গ্রামে চলে এলাম। দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের আল্পস-মারিটিম বিভাগের এই জায়গাটি কান শহর থেকে অনেক ওপরে। এখানে ওঠার সড়কটা বেশ খাড়া। স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর জীবনের শেষ ১১ বছর কেটেছে এখানেই। ছবির মতো একটি গ্রাম। আরেকদিন এখানকার গল্প বলবো।
ইত্তেফাক/জেএইচ
