কান শহরে প্রতিবার এসে প্রথমেই ব্যাজ সংগ্রহ করি। এবার ১০ দিনের কোয়ারেন্টিনের কারণে অনেক আগেই আসতে হয়েছে। কোয়ারেন্টিন শেষে উৎসবে অংশ নেওয়ার প্রথম দিন থেকে নিয়মকানুনে কতো কিছুই না নতুন দেখছি!
পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের মূল ফটকের ঠিক পাশের দরজা দিয়ে নেমে ব্যাজ সংগ্রহ করেছি গত পাঁচবার। এবার এখানে দেওয়া হচ্ছে করোনা প্রতিরোধক টিকা। ব্যাজ হস্তান্তর করা হচ্ছে গার মারিটিম তথা বন্দর স্টেশনে। নিজের নাম ও ছবি এবং দৈনিক ইত্তেফাক লেখা সংবলিত ব্যাজ হাতে দেওয়ার পর কাউন্টার থেকে জানানো হলো, উৎসবের সৌজন্য ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় কাগজ পাওয়া যাবে পালে দে ফেস্টিভালের নিচতলায়। অন্যান্য বছর ব্যাজ দেওয়া হতো সেখানেই। ব্যাজ এক জায়গায়, ব্যাগ আরেক জায়গায়— এ আবার কী নিয়ম! করোনা পরিস্থিতির কারণে কিনা কে জানে! কিন্তু মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এমন নিয়মে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ায় কীভাবে?

৫ জুলাই সকালের কথা বলছি। ব্যাজ গলায় ঝোলাতে পারলেও পালে দে ফেস্টিভাল ভবনে ঢোকা যাচ্ছে না। কারণ প্রবেশপথে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া করোনা নেগেটিভ সনদের কিউআর কোড দেখাতে হবে। ঢাকায় সেই ২৪ জুন সকালে নমুনা পরীক্ষা করিয়েছিলাম। এরপর আর দরকার পড়েনি। হিসাব করে দেখলাম, আগামী ১২ দিনে সাত-আটবার কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাতে হবে। ঢাকার বিমান ধরার আগের দিন আরেকবার।

‘কান কথা-১’ লেখায় জানিয়েছি, এবারই প্রথম আয়োজকরা সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে প্রতিটি ব্যাজের জন্য পরিবেশের কল্যাণে অনুদান হিসেবে ২৪ ইউরো করে নিয়েছেন। টাকার কথা যখন এলোই, কিছু কথা বলা যাক। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব ও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের মতো কান সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত নয়। বরং সংবাদকর্মী, নির্বাচিত চলচ্চিত্রপ্রেমী ও পেশাদার চলচ্চিত্রকর্মীদের জন্য বরাদ্দ থাকে এই আয়োজন।

কানের মার্শে দ্যু ফিল্মের ব্যাজ পেতে গুনতে হয় ৩৪৯ ও ৪৯৩ ইউরো। প্রতি বছর ১২ হাজার প্রযোজক, পরিবেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এতে। মার্শে দ্যু ফিল্মের এই দুই ধরনের অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সেশনে অংশগ্রহণের সুযোগ মেলে। তবে ২ হাজার ১০০ ইউরোর প্লাটিনাম ব্যাজধারীদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষ করে লালগালিচা অনুষ্ঠান সংবলিত গালা স্ক্রিনিংয়ে।

কানে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের ২ হাজার ৩০০ আসন সমৃদ্ধ গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে। কিন্তু শুধু অ্যাক্রেডিটেশন থাকলেই এগুলো উপভোগ করা যাচ্ছে না। এবার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাজধারী সবাইকে অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। গত ৪ জুলাই থেকে এই সুযোগ উন্মুক্ত হয়। তবে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের টিকিট চেয়ে আবেদন করলেও তা মেলে খুব কম। যেমন আমিই প্রেক্ষাগৃহটিতে ১০টি ছবি দেখার টিকিট চেয়ে পেয়েছি চারটি। সাল দুবুসি, সাল বাজিন কিংবা সাল দ্যু সোসানতিয়েম থিয়েটারের টিকিট ইমেইলে পেতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না।

আগের পাঁচবার দেখেছি, কানে গড়ে চার হাজার সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেছেন। তখন স্বাস্থ্যঝুঁকি বলতে কিছু ছিলো না। তাদের কাউকেই প্রেস স্ক্রিনিংয়ে ঢুকতে আগাম টিকিট কাটতে হয়নি। তবে প্রেক্ষাগৃহের সামনে ব্যাজের রঙ অনুযায়ী সারিবেঁধে দাঁড়াতো হতো। আয়োজকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ, সংবাদমাধ্যমের আকার কিংবা সংবাদকর্মীর পদ অনুযায়ী রঙের পার্থক্য থাকে ব্যাজে। যেমন ফ্রিল্যান্সার ও স্থায়ী কর্মীদের ব্যাজের রঙ একই হয় না।
শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে সাদা রঙের পাস খুব গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকরা পেয়ে থাকেন। তাদের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহের দুয়ার খোলা। এরপর গোলাপি-হলুদ ব্যাজধারীরা গুরুত্ব পান। তৃতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয় গোলাপি ব্যাজকে। এরপর নীল ও হলুদ ব্যাজ। সবশেষে কমলা ব্যাজ পান আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফাররা। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় এই রঙ-বেরঙ। কারণ আসন সংখ্যা সীমিত। সাদা, গোলাপি-হলুদ ও গোলাপি ব্যাজধারীরা আসন ভরে ফেললে কপাল পোড়ে নীল ও হলুদ ব্যাজের।

অন্যান্যবার কান উৎসবে আয়োজকদের যাবতীয় প্রকাশনা ব্যাজ সংগ্রহের সময় ব্যাগে ভরে দেওয়া হতো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে পরিবেশের সুরক্ষায় এবার এগুলোর অনলাইন সংস্করণ পেলাম কানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে। অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া প্রত্যেকের জন্য এবার ওয়েবসাইটটিতে ‘মাই কান’ নামে নতুন একটি অপশন রাখা হয়েছে। এতে টিকিট অফিসের ওয়েবসাইটে যাওয়ার লিংক, স্বাস্থ্য সুরক্ষা পদ্ধতিও আছে।
অন্যান্যবার উৎসবের ছবিগুলো পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের থিয়েটারগুলো ছাড়া যেসব প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হতো, এবারও সেগুলো রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিনেয়ুম মাল্টিপ্লেক্স। বাসে চড়ে সেখানে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিউআর কোড ব্যবহার করলে ভাড়া লাগে না। অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহের মতো মাল্টিপ্লেক্সেও করোনা নেগেটিভ সনদ দেখাতে হয় না। শুধু টিকিট থাকলেই চলে। তবে পালে দে ফেস্টিভালে ঢুকতে ব্যাজ বা টিকিটের মূল্য পরে, আগে করোনা নেগেটিভ সনদ। নিরাপত্তাকর্মীরা কিউআর কোড স্ক্যান করে যার নাম ভেসে উঠতে দেখেন সেই নামের সঙ্গে ব্যাজের নাম মিলিয়ে যাচাই করেন। তারপর ঢুকতে দেন।

ভবনের দোতলায় প্রেস রুমে গত পাঁচবার ডেস্কটপ পিসি ও প্রিন্টার দেখেছি। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এবার শুধু টেবিল ও চার্জিং পয়েন্ট রাখা হয়েছে এখানে। ওয়াইফাই বরাবরের মতোই আছে। তৃতীয় তলায় সংবাদ সম্মেলন কক্ষের পাশে ওয়াইফাই ক্যাফেতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রিন্টার। আরেক পাশে সংবাদকর্মীদের বসে কাজ করার জায়গা একই আছে। চারতলায় তেরাস দো জার্নালিস্টসের অবয়ব বদলেছে। তবে পানি, কফি ও সফট ড্রিংকস বিনামূল্যে পাচ্ছেন সাংবাদিকরা। বোনাস হিসেবে আছে কিছুটা পাখির চোখে ভূমধ্যসাগরের অপার মনোরম সৌন্দর্য দেখার সুযোগ।
ইত্তেফাক/জেএইচ
