রেজাউল করিম খোকন
জবাইয়ের পর একটি গরুর আকারভেদে ১৫ থেকে ২৫ কেজি হাড় ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এসব হাড় সংগ্রহ করে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যবসা হয়। এই হাড় রপ্তানিতে ব্যবসায়ীরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বছরে শতকোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। চীন ও থাইল্যান্ডে গরুর হাড়ের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে হাড়ের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। হাড় দিয়ে ওষুধ, সিরামিক, পণ্যসামগ্রী, বোতাম ও ঘর সাজানো উপকরণ তৈরি করা হয়। কিন্তু অসচেতনতা ও অবহেলার কারণে কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। অথচ কোরবানিসহ সারা বছর জবাই করা গরুর হাড়ের মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। পশুর রক্ত, গোবর, নাড়িভুঁড়ি, হাড় ও অন্যান্য উচ্ছিষ্টাংশ জৈব সার, বোতাম, চিরুনি, মত্স্যখাদ্য, পশুখাদ্যসহ বেশ কিছু শিল্পে ব্যবহার করা যায়। পশুর হাড় দিয়ে ওষুধ ক্যাপসুলের কভার, মুরগির খাবার, জমির সার, চিরুনি, পোশাকের বোতাম তৈরি হয়। নাড়ি দিয়ে অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে সাবান, পায়ের খুর দিয়ে অডিও ভিডিওর ক্লিপ, তৈরি করা হয়। সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও গরুর হার ব্যবহূত হয়। এ ছাড়াও জার্মানি ও ইতালিতে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পশুর শিং সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
দেশের গবাদি পশুর শরীরের কোনো অংশই ফেলনা নয়। মাংস এবং চামড়ার কদর তো সবার জানা। বর্তমানে দেশে জবাইকৃত গরু মহিষ ছাগলের মাংস ও চামড়া ছাড়া অবশিষ্টাংশ বিদেশে রপ্তানি করে আয় হচ্ছে ২৯০ কোটি টাকা। যদিও বর্তমানে মোট বর্জ্যের মাত্র ২০ শতাংশ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাকি ৮০ শতাংশ পচে-গলে নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবেশকে দুষিত করছে। পুরো বর্জ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা গেলে এ খাত থেকে বছরে ১ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে ২৫০ কোটি আয় করা সম্ভব হবে। গরু-মহিষের নাড়িভুঁড়ি (ওমাসম) বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। অপ্রচলিত এ পণ্যের রপ্তানি দিন দিন বাড়ছে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১৫০-২০০ কোটি টাকার সমমূল্যের ওমাসম বিদেশ রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্যের সিংহভাগই রপ্তানি হচ্ছে প্রধানত চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে। ইতিমধ্যে গরুর নাড়িভুঁড়ি রপ্তানি করছেন, এমন রপ্তানিকারকদের সংখ্যা ৫০-এ পৌঁছেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোক ঠিক করে বছর জুড়েই তারা গরুর নাড়িভুঁড়ি সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছেন। কোরবানির ঈদের সময় সংগ্রহ করা মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। তারপর প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নাড়িভুঁড়ি থেকে চর্বি বের করে ফেলা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এখন মাসে গড়ে ২৫টি কনটেইনার গরু-মহিষের নাড়িভুঁড়ি (ওমাসম) রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিটি কনটেইনারে ৬০ থেকে ৭০ হাজার পিস ওমাসম থাকে। একসময় উচ্ছিষ্ট হিসেবে গরু-মহিষের নাড়িভুঁড়ি খাল, নদীনালা, ডোবায় ফেলে দেয়া হতো। এক টন (এক হাজার কেজি) প্রক্রিয়াজাত করার পর ৭০০ কেজি ওমাসম পাওয়া যায়। ওমাসম দিয়ে উন্নত মানের সুপ ও সালাদ তৈরি হয় এবং তা চীনাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় খাবার বলে বিবেচিত। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও এখন ইউরোপেও ওমাসম রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অপ্রচলিত পণ্য ক্যাটাগরিতে ওমাসম রপ্তানিতে বর্তমানে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। তবে গরু-মহিষের নাড়িভুঁড়ি রপ্তানিকারকরা ৩০ শতাংশ নগদ সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের ওমাসম রপ্তানি আরো বাড়বে। সারা বিশ্বে ৩২ হাজার কোটি টাকার ওমাসমের বাজার রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত এক সার্কুলারে গরু-মহিষের নাড়িভুঁড়ি, শিং, রগ ইত্যাদি রপ্তানিকারকরা নগদ সহায়তা পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রপ্তানি প্রণোদনার তালিকায় এই বর্জ্য ফেলনা পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। তবে এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে আরো বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আমাদের রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। কারণ এর মাধ্যমেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারবে আগামী দিনগুলোতে।
