আলি জামান
আমাদের দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বেশ তীব্রভাবে আঁছড়ে পড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এইটা গভীরভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। খুলনা থেকে সাতক্ষীরা, যশোর হয়ে একেবারে হিলি পর্যন্ত করোনা বিস্তৃত হয়েছে। আগে করোনার প্রকোপ শহরাঞ্চলে দৃশ্যমান হলেও এবার এসমস্ত জেলার গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে এই করোনার অভিঘাত, অন্যদিকে সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার সমস্যা। এ যেন উভয় সংকট। রাজধানী আর বড় শহরগুলোতে টিসিবি ট্রাকে করে সয়াবিন, চিনি, ডাল বিক্রি করছে—বাজার দামের চেয়ে কমে। প্রয়োজনের তুলনায় নিত্যান্ত নগণ্য হলেও এই প্রয়াস প্রশংসনীয়। কিন্তু, টিসিবির এই পণ্য কিনতে দীর্ঘ লাইন—প্রমাণ করে যে, সাধারণ-দরিদ্র জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা যথেষ্ঠ কমে গেছে। করোনার কারণে বারবার লকডাউন দেওয়া হচ্ছে। এই সময়ে সরকারি চাকুরেরা নির্দিষ্ট বেতন, আর বিভিন্ন প্রকার ভাতা পেয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে পারলেও বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের চাকুরিজীবী, শ্রমিক-কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সরকার ঈদ উপলক্ষ্যে সব প্রকার লকডাউন উঠিয়ে দিয়েছে। অবশ্য গত দুই সপ্তাহের লকডাউন তেমন কার্যকর করা যায়নি। রিকশা চলাচলে বাধা দেওয়া হয়নি। প্রাইভেটকার আর বাইক তো প্রথম থেকেই চলছে। কেবল প্রধান সড়কের দোকান, ক্ষুদ্র শিল্পব্যবসা আর গণপরিবহন বন্ধ ছিল। এই হলো—রাজধানীর লকডাউন পরিস্থিতি। এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সময় দোকান, শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে। গরুর হাট চালু করা হয়েছে। গণপরিবহনও চালু করা হয়েছে। তবে ঈদের পর ২৩ তারিখ থেকে নাকি সর্বোতভাবে লকডাউন কার্যকর করা হবে বলে ঘোষণা হয়েছে। সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকারখানাও বন্ধ রাখা হবে, এমনটা বলা হয়েছে। আগের লকডাউনের সময় বড় শিল্পকারখানাগুলো চালু ছিল। কিন্তু ক্ষুদ্র শিল্পগুলো জোর করে বন্ধ রাখা হয়।
বন্যা বা অন্যকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে, কিছু দিনের মধ্যে সেই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটে। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু করোনাকাল শিগগিরই কেটে যাবে, এমনটা মনে হচ্ছে না। তাই, আরো কিছুকাল করোনা নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। জীবিকার তাগিদ মেটাতে হবে। করোনার সময়েও সরকারের রাজস্ব আদায় অনেক বেড়েছে। সরকার তা থেকে-এবারের বাজেটে করোনা পরিস্থিতির উত্তরণে অর্থের সংকুলান রেখেছে। সেক্ষেত্রে এই অর্থ অবিলম্বে বণ্টন শুরুর সময় এসেছে এবং এই কাজ দ্রুত করতে হবে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হবার আগেই। সরকারি গুদামে এখন অনেক উদ্বৃত্ব খাদ্য মজুদ রয়েছে। আবার লকডাউন কার্যকর করার আগে-দরিদ্র নাগরিকদের খাদ্য সহায়তা দিতে হবে। পশ্চিমবাংলা, কেরালা, দিল্লিতে এভাবেই লকডাউন কার্যকর করে—করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো হয়েছে।
এসঙ্গে জরুরিভিত্তিতে করোনা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উপায় কি? এক কথায়— টিকা। আগামী মাসের মাঝামাঝি আসবে চীনের সিনোফার্মের টিকা। আর এখন দেওয়া হচ্ছে তাদের উপহারের টিকা। অনুমতি দিলে চীন এদেশে জয়েন্ট ভেঞ্চারে টিকা তৈরি করবে বলে জানিয়েছে। দরিদ্র কর্মজীবী জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা না দিলে লকডাউন সফল করা যাবে না। আর সেইটা যে বেশ কঠিন কাজ তা, এরই মধ্যে বোঝা গেছে। সেক্ষেত্রে করোনা নিয়ন্ত্রণে টিকার কোনো বিকল্প নেই। আমদানি করে টিকা দিতে কয়েক বছর লেগে যাবে। তাই দেশেই টিকা উত্পাদনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
