মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন জরুরি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ২২:২২

মানুষের শরীরে যেমন মাঝেমধ্যেই নানারকম রোগ বাসা বাঁধে, ঠিক তেমনিভাবে মানুষের মনেও বিভিন্ন ধরনের অসুখ বাসা বাঁধে। শরীরের অসুখে আমরা নড়েচড়ে বসি, যত দ্রুত সম্ভব চিকিত্সকের পরামর্শে সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে উঠি। প্রয়োজনে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশ গমন করি। উদ্দেশ্য একটাই, দ্রুত আরোগ্য লাভ করা। একইভাবে মনের অসুখ সারানোর জন্য চিকিত্সা বা যত্নের প্রয়োজন হয়, যা কখনো চিকিত্সক দিতে পারে কখনো বা পরিবার-পরিজন দিতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শারীরিক অসুস্থতাকে যতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়, মনের অসুখ বা মানসিক অসুস্থতাকে ঠিক ততটাই অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়।

সমাজের স্বল্পশিক্ষিত লোকের কথা বাদই দিলাম, শিক্ষিত এবং উন্নত সমাজে বসবাস করা অধিকাংশ মানুষও মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নয়। আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ এখনো মনে করে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন  মানে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া। আরো সহজ করে বললে মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগলের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন জরুরি বলে মনে করে অধিকাংশ মানুষ। যার ফলাফল দিন কে দিন ভয়াবহ হচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮-২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৭ শতাংশ এবং ১৩.৬ শতাংশ শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত। পরিতাপের বিষয়, এদের মধ্যে ৯২ শতাংশ মানুষ সব ধরনের চিকিত্সাসেবা বা পরামর্শের আওতামুক্ত। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে আবার অনেকে সুযোগের অভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।

মানসিক স্বাস্থ্য বলতে যে কেবল মানসিক রোগাক্রান্ত হওয়া নয়, তা বুঝতে অনেকেই অপারগ। সুস্থ শরীরকে যেমন অসুখের হাত হতে রক্ষার জন্য বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মানতে হয়, ঠিক তেমনি মনের সুস্থতার জন্যও কিছু নিয়মের ভেতর দিয়ে যাওয়া জরুরি। মনের এ যত্নের জন্য সবক্ষেত্রে চিকিত্সার প্রয়োজন হয় না, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী বা প্রিয় মানুষটার হাসিমুখে দুটো কথা, হতাশাগ্রস্ত মানুষটিকে সাহস দেওয়া, উত্সাহ প্রদান, খারাপ সময়ে পাশে থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু অধিক ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ পাশে তো থাকেই না বরং মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বললে বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চায় পাছে লোকে আবার পাগল ভাবে সেই ভয়ে। ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘স্বাস্থ্য’ বলতে বুঝিয়েছে, কেবল রোগমুক্ত থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়, বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংজ্ঞা এখনো আমাদের দেশের মানুষের বোধগম্য নয়।

করোনা মহামারিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মানসিক সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর প্রভাব লক্ষণীয়। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে করোনা সংক্রমণের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ১৫ মাসে ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। অধিক সময় ধরে বিদ্যাঙ্গন বন্ধ থাকার ফলে সবাই পরিবারের সঙ্গে গৃহবন্দি সময় পার করছে। একজন মানুষের জীবনে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মানুষের জীবনে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা পরিবারের সঙ্গে নয়, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করলে সমাধান মেলে। দীর্ঘ এই সময়ে গৃহবন্দি জীবনে সঙ্গহীনতার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা বাসা বুনেছে, যার ফলাফল সম্ভাবনাময় তরুণদের অকালে ঝরে পড়া। এছাড়া অনেকে আবার মানসিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে প্রতিনিয়ত। মনের অসুখের প্রাথমিক পর্যায়েই আত্মহনন বা বাজে কোনো নেশার পথ বেছে না নিলেও নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ ধীরে ধীরে বিপথগামী হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ সমাজে নানা রকম অপকর্ম বেড়ে যাওয়া।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও সমস্যার তুলনায় তা সামান্য। করোনা প্রভাবে তা আরো কমে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে বিশ্বের ৯৩ শতাংশ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিশ্ব জুড়েই দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের অসংগতি।

শুধু করোনাকালেই নয়, স্বাভাবিক সময়েও অনেক অপার সম্ভাবনা ঝরে পড়ে মানসিক যত্নের অভাবে। তাই সময় এসেছে শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক যত্নের দিকেও নজর দেওয়ার। মানসিক সমস্যা বা মানসিক যত্ন মানেই মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনতা নয়, এই বিষয়টি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো বর্তমানে অপরিহার্য। পরিবারের সদস্যদের বুঝাতে হবে একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়া মানেই সে সব ধরনের সমস্যা মুক্ত নয়। একজন অভাবগ্রস্ত মানুষের যেমন মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজন, একজন স্বাবলম্বী মানুষেরও মনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি, প্রয়োজনে ক্যাম্পেইন, ওয়েবিনার, আলোচনাসভা, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাদের করণীয় সম্পর্কে জানাতে হবে। অন্যথায়, সমাজের অপমৃত্যু, হতাশা, বিকারগ্রস্ততা, অপরাধপ্রবণতার হার ক্রমেই বাড়তে থাকবে। আশা রাখা যায়, সমাজের সর্বস্তরে মনের যত্নের সচেতনতার মাধ্যমে সমাজ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কুসংস্কারগুলো দূর হবে এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে আর কেউ বিপথগামী হবে না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়