কিছুতেই যেন কাজ হইতেছে না। থামানো যাইতেছে না রক্ত আর অশ্রুর স্রোত। অথচ উদ্যোগ-আয়োজনের কোনো অভাব নাই। নজিরবিহীনভাবে সড়কে চলমান নৈরাজ্য বন্ধের দাবিতে সারাদেশ প্রকম্পিত করিয়াছে আমাদের শিশুকিশোর শিক্ষার্থীরা। নীতিনির্ধারক মহল হইতে জারি করা হইতেছে উপর্যুপরি সতর্কবার্তা। মালিক-চালক ও পরিবহন শ্রমিকরা বৈঠক করিয়া নানা অঙ্গীকারও ব্যক্ত করিয়াছেন জনসমক্ষে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরিয়া প্রায় বিরতিহীনভাবে পালিত হইতেছে ট্রাফিক পক্ষ। নিয়ম ভাঙার দায়ে লক্ষ লক্ষ মামলাও হইতেছে প্রতিমাসে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রমতে, ট্রাফিক পুলিশের চারটি বিভাগ শুধু ২০১৮ সালেই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের নিকট হইতে প্রায় শত কোটি টাকা জরিমানা আদায় করিয়াছে। ওই সময়ে বিভিন্ন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হইয়াছে ১২ লক্ষাধিক। পাশাপাশি, জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলিতেছে বিভিন্ন ধরনের প্রচার কার্যক্রম। কিন্তু দেশের সড়ক-মহাসড়ক জুড়িয়া চলমান চরম বিশৃঙ্খলা থামিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। পরিবহন মালিক, চালক-শ্রমিক-পথচারী নির্বিশেষে কেহই কোনোপ্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা করিতেছেন না। গাড়িচালকরা যেমন বেপরোয়া, তেমনি কম যান না পথচারীরাও। যাহার যেখানে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা ব্যস্ত রাস্তার উপর দিয়া রাস্তা পারাপার করিতেছেন। এমনকি নিজের জীবনের প্রতি মমত্ববোধটুকুও যেন নাই কাহারও মধ্যে। এই যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ইহার জন্য আমরা কাহাকে দায়ী করিব? রূঢ় বাস্তবতা হইল, এককভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করিবার অবকাশ নাই। আবার কেবল এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে না যে এই অবস্থার জন্য সকলেই সমানভাবে দায়ী। কারণ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ক্ষুদ্রায়তন এই দেশের প্রায় সর্বত্রই মানুষ ও যানবাহনের যে ভয়াবহ জট তৈরি হইয়াছে, সীমিত সম্পদ দিয়া তাহা সামাল দেওয়া মোটেও সহজসাধ্য কাজ নহে।
সবকিছুর যোগফল হইল, বিশৃঙ্খলা দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। দীর্ঘ হইতেছে মৃত্যুর মিছিল। মঙ্গলবার এই সম্পাদকীয়টি যখন লেখা হইতেছে, সেইদিন শুধু রাজধানীতেই ঝরিয়া পড়িয়াছে কমপক্ষে সাতটি তরতাজা প্রাণ। তন্মধ্যে রহিয়াছে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিশুশিক্ষার্থী ফাইজাও। বাবা, ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় সহকারী, ফাইজুল ইসলামের হাত ধরিয়া স্কুলে যাইবার পথেই বেপরোয়া গতির একটি মাইক্রোবাস শিশুটিকে চাপা দেয়। আছেন একজন চা-বিক্রেতা ও দায়িত্বরত নৈশপ্রহরীও। ফুটপাতের উপর উঠিয়া আসিয়া নিয়ন্ত্রণহীন একটি বাস তাহাদের চাপা দেয়। ইহার সোজাসাপ্টা অর্থ হইল, বেপরোয়া যন্ত্রদানবের হাত হইতে মানুষ এখন কোথাও নিরাপদ নহে। মধ্যযুগের বিশিষ্ট বাঙালি কবি ভারতচন্দ্র লিখিয়াছিলেন, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’। কথাটি এই ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে যে নৈরাজ্য চলিতেছে, তাহাতে কাহারও জীবনই এখন নিরাপদ নহে। প্রশ্ন হইল, সকলের মধ্যে এই ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব কেন? ইহার শিকড় খুঁজিয়া পাইতে গলদঘর্ম গবেষক হইবার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের চতুর্দিকে, সর্বত্রই বিশৃঙ্খলার যে বিশাল বটবৃক্ষ সগর্বে দণ্ডায়মান—সড়ক-মহাসড়কের নৈরাজ্যকে তাহা হইতে আলাদা করিয়া দেখিবার বিন্দুমাত্র অবকাশ নাই। ইহা সেই বটবৃক্ষেরই শিকড়বাকড় মাত্র। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, এইভাবেই চলিয়া আসিতেছে। এইভাবেই চলিবে— যদি না আমাদের মানসিকতার বদল হয়। মানসিকতার পরিবর্তন কঠিন, তবে অসম্ভব নহে। ইহার জন্য জোরালো রাজনৈতিক সংকল্পের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রবল সামাজিক দায়বদ্ধতা। শৃঙ্খলা আপনাআপনি আসে না। ইহার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন। অতীব জরুরি সেই কাজটি শুরু করিতে হইবে পরিবার হইতেই, আর সেই অনুশীলন ছড়াইয়া দিতে হইবে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই। ইহা ছাড়া পরিত্রাণের আর কোনো পথ খোলা আছে বলিয়া তো মনে হয় না।
