এই লইয়া টানা প্রায় ১৩ বত্সর যাবত্ বিশ্বজুড়িয়া গণতন্ত্রের অবনমন ঘটিয়া চলিয়াছে। বৈশ্বিক গণতন্ত্র লইয়া গবেষণাকারী প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের সদ্য-প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন হইতে এই তথ্য জানা যাইতেছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের গণতন্ত্র পরিস্থিতির উপরে আলোকপাত করিয়া এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হইয়াছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে, সুনির্দিষ্টভাবে বলিতে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর হইতে, সারা দুনিয়াতে নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জয়জয়কার ঘটে। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন এই সময়কালকে ‘গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউ’ হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছিলেন। এই সময়কাল হইতেই দিকে-দিকে সামরিক শাসনের অবসান ঘটিতে থাকে এবং একনায়কতান্ত্রিক অনেক দেশে গণতন্ত্রের আগমন ঘটে। আবার অনেক দেশেই একনায়কেরাই তাহাদের ক্ষমতার রাশ আলগা করিতে বাধ্য হন। কিন্তু নূতন শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময়ে আসিয়া দেশে-দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি একধরনের অনীহা-উদাসীনতা পরিদৃষ্ট হইতে শুরু করে। বিশেষ করিয়া, ২০০৮ সালের দিকে পশ্চিমা অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হইবার পরে দীর্ঘকাল ধরিয়া গণতন্ত্র চর্চাকারী দেশগুলিতেও এই দুষ্ট প্রবণতা দেখা দেয়। গণতন্ত্র-বিশেষজ্ঞ ল্যারি ডায়মন্ড ইহাকে ‘গণতন্ত্র-ঘাটতি’ হিসাবে চিহ্নিত করিতেছেন। ফ্রিডম হাউসের এইবারের প্রতিবেদনেও এই ঘাটতি বহাল থাকিবার বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। তাহাদের হিসাবমতে, গত বত্সরটিতে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার বিচারে সর্বমোট ৬৮টি দেশে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনমন ঘটিয়াছে। ইহার বিপরীতে ৫০টি দেশে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটিয়াছে। পরিস্থিতির অবনমন যে কেবল বিকাশমান গণতান্ত্রিক দেশগুলির ক্ষেত্রে ঘটিতেছে তাহা নহে, বরং পরিণত গণতান্ত্রিক দেশের অনেকগুলিতেও পরিস্থিতির অবনমন ঘটিতেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের দেশে-দেশে উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদীদের রাজনৈতিক উত্থান এইক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে উঠিয়া আসিয়াছে। রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলিতে গণতন্ত্রের প্রতি চ্যালেঞ্জকারী শাসকেরাও গোটা বত্সরজুড়িয়াই শক্তি সঞ্চয়ে সক্ষম হইয়াছেন। ফ্রিডম হাউস বিশ্বজুড়িয়া গণতন্ত্রের অবনমন চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ছয়টি বিশেষ ক্ষেত্র চিহ্নিত করিয়াছে। এইগুলি হইতেছে— নির্বাচন, সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট মেয়াদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অভিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ, বিদেশিদের নিরাপত্তা ও জাতিগত নির্মূলকরণ।
ফ্রিডম হাউসের গবেষণা হইতে এই বার্তাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, পৃথিবীর অনেক দেশের শহুরে সুশীল সমাজ যত হালকা করিয়া গণতন্ত্রকে হাতের মুঠোয় পুরিয়া ফেলিতে চাহেন, ব্যাপারটি কিন্তু তত সহজ নহে। রাজনীতিতে গণতন্ত্র পাইতে হইলে সমাজদেহে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের কষ্টকর কাজটি করিয়া যাইতে হইবে। এই দুইক্ষেত্রে সফল হইতে পারিলেই কেবল গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু হইবে।
