সিরীয় সংকটে নতুন মাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ তখন তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সিরিয়া থেকে আকস্মিকভাবে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে।
আরব জাহানের মার্কিন মিত্ররা আসাদ সরকারের সঙ্গে ক্রমশ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সেখানে আপসহীন তুরস্ক একরকম মিত্রহীন হয়ে পড়েছে। প্রথমত, তুরস্ক তার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কুর্দিদের থেকে হামলার আশঙ্কা করছে। দ্বিতীয়ত, আসাদ বিরোধী অবশিষ্ট সশস্ত্র যোদ্ধাদের সামাল দেওয়ার ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, পরস্পর বিরোধী রুশ-মার্কিন অবস্থান থেকে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কঠিন কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে হচ্ছে। এরপরও আছে লাখ লাখ উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তুরস্ক সিরিয়ার উত্তরে ৩২ কিলোমিটার ব্যাপী একটি নিরাপদ এলাকা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। তুর্কিরা একে বলছে ‘বাফার জোন’। তাদের ভাষায় সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্রোহী কুর্দীদের নিয়ন্ত্রণ ও উদ্বাস্তুদের নিরাপদ নির্গমন এর উদ্দেশ্য। এ প্রস্তাবনা নিয়ে দুই পরাশক্তি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, উভয়পক্ষের বিরাগভাজন হয়েছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার কূটনৈতিক কুশলতা দ্বারা উভয়পক্ষের ক্ষোভ প্রশমিত করেছেন। পরাশক্তিদ্বয় কতিপয় শর্তসাপেক্ষে নিরাপদ জোন অনুমোদনে রাজি হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা জানিয়েছে। কিন্তু তর সইছে না তুরস্কের। এরদোগান বলেছেন, তাদের ধৈর্য সীমাহীন নয়। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেভলুত কভাসকলু বলেছেন, সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর সহযোগিতা ব্যতিরেকে তুরস্ক এককভাবে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠনে সক্ষম।
এই সংকটের পটভূমি তৈরি হয় ২০১১ সালে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র গণতন্ত্রের নতুন হাওয়া বইতে থাকে। এ হাওয়ার নাম ‘আরব বসন্ত’। দীর্ঘদিন ধরে দামেস্কের সিংহাসনে আসীন প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দেখা দেয়। বহু দল গোত্র ও নানা ভাবে বিভক্ত সিরীয় জনগণ স্ব-স্ব সম্পৃক্ততা এবং সুবিধা অনুযায়ী গৃহযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী দেশ ও জাতিসমূহও যার যার যোগাযোগ ও স্বার্থ সুবিধাকে কেন্দ্র করে পক্ষ ও বিপক্ষে অবস্থান নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে’ সরকার বিরোধী পক্ষে অবস্থান নেয়। মার্কিন বশংবদ সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশগুলো, তুরস্ক এবং অবশেষে মিসর সিরীয় গৃহযুদ্ধে বাসার আল আসাদ বিরোধী যুদ্ধজোটে সর্বাত্মক অংশ নেয়। তুরস্ক ইতিপূর্বে সিরীয় সরকারের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখলেও সম্ভবত মার্কিন প্রভাবে ভোল পালটে দেয়। মিসরে আল ইখওয়ান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে নতুন সামরিক সরকার মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সরকার বিরোধী জোটে যোগদান করে। পাশ্চাত্যের প্রধান দেশসমূহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন প্রদান করে। শুধু তাই নয় ব্রিটেন ও ফ্রান্স আসাদ বিরোধী সশস্ত্র জোটে অংশগ্রহণ করে এবং সিরিয়ায় ব্যাপক বোমা বর্ষণে অংশ নেয়। গৃহযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে সিরীয় ও ইরাকের ব্যাপক এলাকা দখল করে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করে। এ ঘটনায় সিরীয় গৃহযুদ্ধ নতুন তাত্পর্যপূর্ণ মোড় নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি রাষ্ট্রকে প্রধান শত্রু মনে করে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেয়। এসময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইসলামি রাষ্ট্র ধ্বংসের ভান করে মার্কিন অনুমোদনে সিরীয় যুদ্ধে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আকস্মিকভাবে অংশগ্রহণ করে। মূলত সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর পতন আসন্ন হওয়ায় বাসার আল আসাদকে রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। রুশ বাহিনীর অংশগ্রহণে অবশেষে পতনোন্মুখ সরকারি বাহিনী এক রকম বিজয় অর্জন করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্থির ও অদূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির ফলশ্রুতিতে অবশেষে এই সেদিন সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক এক নতুন সমীকরণের সম্মুখীন হয়। তুরস্ক তার সিরিয়া সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সিরীয় কুর্দিদের নিয়ে নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়।
আগেই বলা হয়েছে, তুরস্ক চাচ্ছে এর উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে। উল্লেখ্য যে, কুর্দিজাতি ব্রিটিশ-ফরাসি ষড়যন্ত্রে ৪ দেশে ভাগ হয়ে আছে। ইরাক-ইরান, তুরস্ক-সিরিয়া-এই ৪ দেশে যোদ্ধা জাতি কুর্দিদের বসবাস। ৪ দেশই কুর্দিদের নিয়ে সমস্যায় আছে। স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। কুর্দিদের গরিষ্ঠ অংশ রয়েছে তুরস্কে। তুরস্কের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করেছেন এরদোগান। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি-পিকেকে ১৯৮৪ সাল থেকে রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করছে। ২ বছর আগে ইরাকি কুর্দিরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই কুর্দিদের কাজে লাগিয়ে পাশ্চাত্য তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এখন সিরিয়ার কুর্দিরা প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। এখানে তারা তুরস্ক সীমান্তের নিকটবর্তী ছোট্ট জনপদ মানবিজ এক রকম জিম্মি হয়ে পড়েছে।
তুর্কিরা বলছে কুর্দিরা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। সুতরাং সেখানে তুর্কি ভূখণ্ড এবং সিরীয় ভূখণ্ডের মাঝে ‘বাফার জোন’ বা মধ্য এলাকা তৈরি হতে হবে। তুর্কিরা ঐ সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে। এর আগে তারা কুর্দি অধ্যুষিত আফরিন দখল করেছে। আরেকটি এরকম অঞ্চল তালরিফাত। এখানে তুর্কীরা তিন তিন বার গোলা বর্ষণ করেছে। মূলত দজলা নদীর সমগ্র পূর্ব অংশে প্রাধান্য বিস্তার করতে চায় তুরস্ক। তারা দাবি করছে যে, ১৯৭৮ সালে সিরিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত প্রটোকল অনুযায়ী কুর্দী অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তাদের রয়েছে। আঙ্কারা সরকার যুক্তি দেখাচ্ছে যে, সিরিয়ার ঐ এলাকায় প্রাধান্যশীল পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট-ওয়াই পি জি, আসলে পিকেকে এর সিরীয় অংশ।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষ, জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তর, উদ্বাস্তুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান রুশ প্রীতির কারণে মার্কিন-তুর্কি সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। ইতোমধ্যে আরব আমিরাত এবং বাহরাইন দামেস্কে তাদের দূতাবাসের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন সৌদি প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ঐ কার্যক্রম শুরু করেছে। সেই সঙ্গে কুর্দিদের প্রতি সৌদি মহলের সমর্থনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উল্লেখ্য যে, গত ২ অক্টোবর ২০১৮ সাংবাদিক জামাল খাশোগীকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে হত্যার পর সৌদি-তুর্কি সম্পর্ক ন্যূনতম পর্যায়ে রয়েছে। সৌদি-তুর্কি সম্পর্ক অবনতির বড় আর একটি কারণ কাতার সংকট। তুরস্ক কাতার অবরোধে সৌদি জোটের বিরোধিতা করেছে। কাতারের নিরাপত্তার জন্য সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন রয়েছে। কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে সৌদিরা সেখান থেকে তুর্কি সেনা প্রত্যাহার চেয়েছে। সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা কুর্দি সংগঠন—ওয়াই পি জে এবং পিকেকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে না। সাম্প্রতিক কালে সৌদি মিত্ররা ইরানের ব্যাপারে এতটাই বিদ্বেষী হয়ে উঠেছে যে, এরা নিজেদের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করতে চায়।
সংবাদ সংস্থাগুলোর বিবরণী মোতাবেক সিরীয় কুর্দিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভ, তুর্কি প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ঐ এলাকায় সিরীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ঘোষণা করেছেন। ওদিকে কুর্দিদের নিয়ন্ত্রিত সিরীয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস এসডিএফ বলেছে, তারা মার্কিন সমর্থনে সিরীয় কুর্দিদের রক্ষার জন্য উত্তর-পূর্বাংশে ‘নিরাপত্তা এলাকা’ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। তারা কুর্দিদের বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা চাইবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, টুইটারে এ ধরনের নিরাপত্তা বলয়ের প্রস্তাব করেছিলেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এ প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছেন বলে বার্তা সংস্থা জানিয়েছে। এরদোগানের ‘বাফার জোন’ আর ট্রাম্পের ‘সেইভ জোন’-এর মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই বলে বার্তা সংস্থার সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়। ‘বাফার জোন’ হলে তা এককভাবে তুর্কি কর্তৃত্বাধীনে থাকবে। অপরদিকে ‘সেফ জোন’-এ সংশ্লিষ্ট দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রুশ ফেডারেশন ও আসাদ সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা থাকবে। প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে দুই নেতা সিরীয় কুর্দিদের নিরাপত্তা বিধানে সক্ষম হবেন বলে কূটনীতিক মহলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। প্রয়োজনে জাতিসংঘ বাহিনীকে ঐ এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া যায় বলে এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে তুরস্ক সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কঠোর মন্তব্যকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘অযাচিত’ মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। ‘নিরাপত্তা এলাকা’ বা ‘সেইভ জোন’ এর প্রতি সকল মহলের সমর্থন পাওয়া গেলে আপাতত ঐ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
সিরীয় সংকট যেন ছোট গল্পের মতো—‘শেষ হইয়েও হইল না শেষ।’ দীর্ঘ ৮ বছর ধরে সিরীয় জনগণ অসম্ভব দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। একটি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করেছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে আশ্রয় নিয়েছে। সিরিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
