করোনা নিয়ে বরিস জনসনের জুয়া!

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ২০:৫৬

তালেব রানা

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারও বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, করোনার ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। এই ভ্যারিয়েন্টের কারণে এশিয়া, ইউরোপের অনেক দেশে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া করোনা সংক্রমণের নতুন কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেন, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ সংক্রমণ ঠেকাতে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেছে।

ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব ইতিমধ্যেই করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা গত চার সপ্তাহ ধরে নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। বাড়ছে মৃত্যুও। এর মধ্যেই আজ সোমবার থেকে করোনা বিধিনিষেধ তুলে নিচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ঘোষণা দিয়েছেন, ১৯ জুলাই থেকে ইংল্যান্ডে সব কর্মকাণ্ড চালু হবে, প্রায় সব কোভিড বিধিনিষেধ উঠে যাবে। এই দিনটিকে ব্রিটেনের জন্য ‘ফ্রিডম ডে’ বা স্বাধীনতা দিবস বলে বর্ণনা করছেন তিনি।

আজ থেকে ইংল্যান্ডে সব নৈশক্লাব খুলে যাবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম আর থাকবে না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কত লোককে আমন্ত্রণ জানানো যাবে, তার ওপর যে বিধিনিষেধ চলমান, সেটাও উঠে যাবে। বেশির ভাগ জায়গায় আর মাস্ক পরতে হবে না, তবে লন্ডনের বাস-ট্রেনে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকই থাকছে।

ব্রিটেন হচ্ছে বিশ্বের প্রথম কোনো দেশ, যারা জনসংখ্যার এক বিপুল অংশকে টিকা দেওয়ার পর বিধিনিষেধ তুলে নিতে যাচ্ছে। দেশটিতে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ টিকার প্রথম ডোজ এবং ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ দুটি ডোজ গ্রহণ করেছে। এ কারণেই বরিস জনসন সাহস দেখাচ্ছেন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার।

সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, যুক্তরাজ্যের টিকাদান কর্মসূচি যেহেতু অনেক এগিয়ে আছে, তাই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশ এখন প্রস্তুত। তার মতে, কোভিডের কারণে আরো মানুষের মৃত্যু হতে পারে, আরো অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হতে পারে। কিন্তু তিনি মনে করেন, করোনা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার জন্য এটিই সঠিক সময়।

তবে টিকা দেওয়ার হার বেশি হলেও দেশটিতে ভাইরাস সংক্রমণের নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জুনের শুরু থেকে এক মাসেই ইংল্যান্ডে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ চার গুণ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে লকডাউন দেওয়ার বদলে প্রধানমন্ত্রী জনসন পুরোদমে চালু করে দিতে চলেছেন দেশের অর্থনীতি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কোভিডকে যেন জুয়া হিসেবেই নিচ্ছেন তিনি। ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে তিনি ফিরতে চাইছেন স্বাভাবিক জীবনে।

ব্রিটিশ সরকার বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভীতি রয়েছে। এমনকি শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী বরিস জনসনের এই নতুন কোভিড নীতিকে বিপজ্জনক এবং অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত বলেই বর্ণনা করেছেন।

ইমপেরিয়াল কলেজের মহামারি বিশেষজ্ঞ অ্যান কোরি প্রধানমন্ত্রী জনসনের ‘ফ্রিডম ডে’ পেছানোর ব্যাপারে মত দিয়েছেন। তার মতে, করোনা ভাইরাসকে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকা আদৌ সম্ভব কি না, তা বলার সময় এখন আসেনি। বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করলে ভালো হতো।

মহামারির প্রথমদিকে বিশ্বে অনেক দেশের তুলনায় দেরিতে লকডাউন জারি করেছিলেন বরিস জনসন, যার কারণে পরবর্তী সময়ে দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ ধারণ করে। তিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছিলেন। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি মানুষের করোনায় মৃত্যু হয়েছে দেশটিতে। একবার ভুল করা প্রধানমন্ত্রী আবারও একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

যদিও অনেকেই বলছেন, এই মুক্ত অবস্থায় একটি বিষয় দেখার হলো—কোভিড টিকা মহামারি থামাতে আসলেই কাজ করছে কি না, তার একটি পরীক্ষা হবে ব্রিটেনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভিড-১৯ বিষয়ক বিশেষ দূত ডেভিড নাভারো সম্প্রতি বলেছেন, ব্রিটেন লকডাউন খুলে নেওয়ার মাধ্যমে যে পরীক্ষাটি চালাতে যাচ্ছে, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক দেশই ব্রিটেনের দিকে নজর রাখছে। আগামী এক মাস ব্রিটেনে কী পরিস্থিতি দাঁড়ায়,  সেদিকে নজর থাকবে অনেক দেশের।