রাজধানীতে সড়ক পারাপারের সময় বাবার চোখের সামনে তার একমাত্র কন্যাকে চাপা দিয়ে পিষে হত্যা করলো বেপরোয়া একটি মাইক্রোবাস। ওই কন্যাশিশুর নাম ফাইজা তাহসিনা সূচি (১১)। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে সড়ক পারাপারের সময় এ ঘটনা ঘটে। শিশু সূচি উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা ফাইজুল ইসলাম দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক। পুলিশ ঘাতক মাইক্রোবাসটি আটক করলেও তার চালক ও যাত্রীরা পালিয়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফাইজুল ইসলাম তার কন্যাকে নিয়ে সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর ব্রিজের সড়ক পার হচ্ছিলেন। এ সময় বাবার হাত ধরে থাকা সূচিকে একটি বেপরোয়া মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয়। এতে সূচি রাস্তায় ছিটকে পড়ে। তখন মাইক্রোবাসটি এক মুহূর্তের জন্য গতি কমালে সূচি রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু মাইক্রোবাসটি গতি বাড়িয়ে সূচিকে পিষে দিয়ে চলে যায়। এসময় বাবা ফাইজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাকে রাস্তা থেকে অচেতন ও নিথর অবস্থায় তুলে নিয়ে উত্তরার বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সকেরা জানান- ঘটনাস্থলেই সূচির মৃত্যু ঘটেছে। পরে পুলিশ লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন মাইক্রোবাসটিকে ধাওয়া দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে গতিরোধ করে। তখন চালক মাইক্রোবাস থেকে নেমে দ্রুত পালিয়ে যান। মাইক্রোবাসের যাত্রীরাও একে একে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
সুচির বাবা ফাইজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের সাথে একত্রে চা বিস্কিট খেয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হই। সুচি পরীক্ষা দিতে স্কুলে যাচ্ছিল। সুচির মা ছোট ছেলের হাত ধরে ছিল। সুচির সঙ্গে তার আরেক মেয়েবন্ধুও ছিল। একসঙ্গেই রাস্তা পার হচ্ছিলাম। এর মধ্যেই সুচির ওপর দিয়ে চলে যায় মাইক্রোবাস। চোখের সামনেই আমার সব শেষ হয়ে গেলো। মাইক্রোবাসের চাপায় প্রথমে তার মাথা থেঁতলে যায়। দ্বিতীয়বার গাড়িটি তার বুক ও পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, কথা ছিল দুপুরে সবাই একসঙ্গে স্কুল ক্যান্টিনে খাব। আমার মায়ের সঙ্গে আর খাওয়া হলো না। আমার মাকে আর খাওয়াতে পারলাম না। আমার মা আর কোনোদিন খেতে বলবে না। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার এক দশকে এই হাতে কত সন্তানের গাড়ি চাপার নিউজ লিখতে হয়েছে। আজকে নিজের মেয়েকে নিয়ে গণমাধ্যমে নিউজ হবে এটা আমি ভাবতে পারি না। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
ফাইজুল ইসলামের এক ছেলে এক মেয়ে। এর মধ্যে সূচি বড়। আর ছোট ছেলের নাম নাকিব মোর্শেদ বর্ণ (৬)। তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থানার প্রফেসর পাড়ায়। আগে তারা মিরপুর এলাকায় থাকতো। শিশু সূচি ক্লাস ফোর পর্যন্ত এবং বর্ণ ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত মিরপুরের মণিপুর স্কুলে পড়েছে। এ বছর সূচিকে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণিতে এবং বর্ণকে ক্লাস টুতে ভর্তি করা হয়। এ কারণে গত মাসের ২৮ তারিখে পুরো পরিবার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে হাউজ বিল্ডিংয়ের সুরমা-২ এর দ্বিতীয় তলার ভাড়া বাসায় ওঠে। গতকাল সকালে ফাইজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নার্গিস ইসলাম দুই সন্তানকে নিয়ে স্কুলে দিয়ে আসার জন্য বের হন। তারা উত্তরার ১০ নম্বর ব্রিজের সড়কে সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে পৌঁছান। এ সময় ছেলে বর্ণ মায়ের সঙ্গে এবং সূচি বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিল। তখন বেপরোয়া মাইক্রোবাসটি সূচিকে চাপা দিয়ে হত্যা করে।
উত্তর থানার ওসি নূরুল মোত্তাকিন বলেন, বাবার সঙ্গে রাস্তা পার হওয়ার সময় পেছন থেকে একটি বেপরোয়া মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৪১৫৭) সূচিকে হত্যার উদ্দেশে চাপা দেয়। এতে মাথা থেঁতলে ঘটনাস্থলেই শিশুটি মারা যায়। পুলিশ মাইক্রোবাসটি জব্দ করেছে। ওসি আরো বলেন, মাইক্রোবাসটি নাটকের শুটিংয়ের জন্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নিয়ে দিয়াবাড়ি এলাকায় যাচ্ছিল। চালকের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে মাইক্রোবাসের মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে। শিগগিরই চালককে গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে, তুরাগ থানার এক এসআই জানিয়েছেন, পুলিশ ইতোমধ্যে মাইক্রোবাসটির চালককে আটক করতে অভিযান শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে মাইক্রোবাসের যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও তিনি জানান।
ইত্তেফাকের তিন ইউনিয়নের শোক
সহকর্মী ফাইজুল ইসলামের মেয়ে ফাইজা তাহসিনা সূচির মৃত্যুতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ইত্তেফাক ইউনিটের প্রধান আবুল খায়ের, উপ-ইউনিট প্রধান মোহাম্মদ শাহযাদা, দৈনিক ইত্তেফাক (এন.এন.পি.পি) ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন খান, সাধারণ সম্পাদক মো. তাজাম্মেল হক, কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. গোলাম আখতার ও সাধারণ সম্পাদক মো.ু আবু জাফর গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। নেতৃবৃন্দ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ড্রাইভারের দ্রুত গ্রেফতার ও তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন।
