বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঈদের এক দিন পর গতকাল শুক্রবার থেকে কঠোর বিধিনিষেধের যে ঘোষণা ছিল সেই সিদ্ধান্তই বহাল আছে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল থেকেই দেশজুড়ে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক, নৌ, রেলপথে সব ধরনের যাত্রী পরিবহন বন্ধ রয়েছে।
বিধিনিষেধ শিথিলের মেয়াদ পিছিয়ে ২৭ জুলাই করার যে গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই বলে উড়িয়ে দিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। এবারের বিধিনিষেধ মানুষের অবাধ চলাফেরায় সরকার ‘সবচেয়ে কঠোর’ হবে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গতকাল শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত চলমান থাকবে। গত ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ফরহাদ হোসেন বলেন, যেহেতু অফিস-আদালত এবং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, রপ্তানিমুখী কলকারখানা- সবকিছু বন্ধ থাকবে, তাই এটা এ পর্যন্ত যতগুলো বিধিনিষেধ পালন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠোর হবে। যেহেতু মানুষের বাইরে আসার প্রয়োজন হবে না, অফিসে যেতে হবে না, গার্মেন্টস কিংবা কারখানায় যেতে হবে না তাই বের হওয়ার অজুহাতও তেমন খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করার জন্য পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করবে।
উল্লেখ্য, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে মানুষের জীবন জীবিকা ও উত্সবের চিন্তা করে ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপন, জনসাধারণের যাতায়াত, ঈদ পূর্ববর্তী ব্যবসা পরিচালনা এবং দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আরোপিত সব বিধিনিষেধ শিথিল করা হলো। একই প্রজ্ঞাপনে ঈদের পর ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত আবারও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপে নির্দেশনা জারি করা হয়। সে আদেশে চলমান বিধিনিষেধের মতোই সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণপরিবহনসহ সকল যাত্রীবাহী যানবাহন বন্ধ এবং শপিং মল ও দোকানপাট বন্ধ থাকবে। এর পাশাপাশি সব ধরনের শিল্প কলকারখানা বন্ধের ঘোষণাও আসে। ফলে যারা বাড়ি গিয়ে ঈদ আনন্দ উদ্যাপন করছেন তাদের কর্মস্থল বা নির্ধারিত গন্তব্যে ফিরে আসতে হবে শুক্রবার ভোর ৬টার মধ্যে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যারা গিয়েছেন, তারা জানেন যে তাদের কর্মক্ষেত্র বন্ধ থাকবে। তারা সময় নিয়ে গেছেন। তারা যেন ৫ তারিখের (আগস্টের) পরই আসেন। কারণ তাদের এখন আসার প্রয়োজন নেই।
রেল : এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রান্সপোর্টেশন শাখা থেকে জানানো হয়, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ঈদের ছুটির পর সরকার আবারও কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। অর্থাত্ শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ৫ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত রেলওয়ের সব যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকবে। তবে কন্টেইনার, খাদ্য, পণ্যবাহী ও বিশেষ পার্সেল ট্রেন চলাচল করবে।
আরো জানানো হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আদেশ কার্যকর থাকবে। এছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে—১. সকল রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিস সার্বক্ষণিক খোলা থাকবে, ২. সকল কর্মকর্তা/কর্মচারী স্ব-স্ব হেড কোয়ার্টারে অবস্থান করবেন, ৩. সরকারের নির্দেশে যে কোনো সময় ট্রেন পরিচালনার প্রস্তুতি থাকতে হবে, ৪. নিরাপত্তার স্বার্থে রেলপথ এবং কোচগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলমান থাকবে ও রেলওয়ে স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথারীতি অব্যাহত রাখতে হবে, ৫. কন্টেইনার, খাদ্যসহ জরুরি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকবে, ৬. প্রান্তিক কৃষকের উত্পাদিত কৃষিপণ্য, সবজি ও অন্যান্য জরুরি পার্সেল মালামাল পরিবহনের জন্য বিশেষ পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে।
৪০৩ জন আটক : করোনা সংক্রমণ রোধে দ্বিতীয় দফায় কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিন গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে ৪০৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বিনা প্রয়োজনে ও মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ায় ২০৩ জনকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টার থেকে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়।
ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেসন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইফতেখারুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিএমপির আটটি ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। মোবাইল কোর্টে ২০৩ জনকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২৭০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক পরিবহন আইনে ৪৪১টি গাড়িকে ১০ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
ইফতেখারুল আরো জানান, সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালনে গতকাল সকাল থেকে একযোগে রাজধানীর রমনা, লালবাগ, মতিঝিল, ওয়ারী, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের বিভিন্ন চেকপোস্টে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
