জীবন বনাম জীবিকা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ২১:৫০

করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রতিদিনই ভাঙছে সংক্রমণের রেকর্ড, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এরই মধ্যে চতুর্থবারের মতো ভিন্ন বাস্তবতায় ঈদ উদ্যাপনের সাক্ষী হয়েছে গোটা দেশ। বিগত দেড় বছর ধরে করোনা মহামারির প্রভাবে ক্রমাগত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। লাগামহীন সংক্রমণ, অগণিত মৃত্যুর পাশাপাশি মহামারির প্রভাবে অর্থনৈতিক সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। করোনার মতো অদৃশ্য ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার পাশাপাশি এই সংকটকালে দেশবাসীর জীবন ও জীবিকার সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারের কাছে।

সম্প্রতি করোনার সংক্রমণ রোধে টানা লকডাউনের পর কঠোর শাটডাউনে গিয়েছে পুরো দেশ। দীর্ঘসময় মহামারির প্রভাবে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রায় আড়াই কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য বরাবরই লকডাউন হয়ে উঠেছে বিভীষিকাময়। আয়ের উত্সটুকু হারিয়ে পথে বসেছে অনেক পরিবার।

মহামারির তাণ্ডবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান সংকট। করোনার দীর্ঘতর প্রভাবে নতুন কর্মসংস্থান তো তৈরি হচ্ছেই না, উপরন্তু হ্রাস পাচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রতিনিয়তই কর্মহীন হয়ে পড়ছে শ্রমজীবী মানুষ। মহামারির শুরুতে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমজীবী কর্মচ্যুত হয়ে পড়েন। চলমান লকডাউন আরো দীর্ঘায়িত হলে হুমকির মুখে পড়বে ৫০ লাখ পোশাকশ্রমিকের কর্মসংস্থান। গত বছরের শেষের দিকে মহামারি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলেও করোনার চলমান দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশের অর্থনীতি পুনরায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান লকডাউনের প্রভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্পকারখানাসহ উত্পাদন শিল্পে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিশেষত পরিবহন খাত, বিপণিবিতান, হোটেল, রেস্তোরাঁর সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে ঈদ-পরবর্তী ফের লকডাউনে সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বন্ধ থাকবে সব ধরনের শিল্পকারখানাসহ দেশের সকল পোশাক-কারখানা। শিল্পোদ্যোক্তারা সিদ্ধান্তটিকে ভালোভাবে না দেখলেও করোনার লাগামহীন সংক্রমণ প্রতিহত করতে কলকারখানা বন্ধ রাখার বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন অনেকে। ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘোষিত কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করতেই এহেন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিতে গভীর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধীনে করা একটি গবেষণামতে, চলমান লকডাউনের কারণে শিল্প, সেবা ও কৃষি খাতে দৈনিক ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, যা মাসের হিসাবে দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৩০০ কোটিও টাকায়। অন্যদিকে, পোশাক-কারখানা বন্ধ রাখলে এর ফলাফল হতে পারে আরো ভয়াবহ। ইউরোপ আমেরিকায় শপিং মল খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশে বেড়েছে বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির চাপ। এমতাবস্থায় পোশাক-কারখানা বন্ধ রাখলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের চাহিদানুযায়ী পোশাক রপ্তানি করতে ব্যর্থ হবে। ইতিমধ্যেই ফের লকডাউনের প্রভাবে পোশাকশিল্পে ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হতে শুরু করেছে। এই রপ্তানি আদেশ বাতিলের ধারা অব্যাহত থাকলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে তৈরি হবে সংকট ও অনিশ্চয়তা, যেটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ফেলবে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।

তাই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই সমন্বিত তত্পরতা বৃদ্ধি করতে হবে। উত্পাদন খাতে উত্পাদনমুখী শ্রমিক ধরে রাখা, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যবসায়-কাঠামোয় স্থিতিশীলতা আনয়ন, রপ্তানিমুখী শিল্প পুনরুজ্জীবিত করার জন্য গৃহীত আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখতে হবে। মহামারিতে কর্মহীন অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সামাজিক সুরক্ষা জাল কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকার কর্তৃক বাজারে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি ও নিম্ন সুদে শিল্প খাতে ঋণসুবিধা প্রদানের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে সেগুলো অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হবে। সব ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তাসহ সকল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে প্রণোদনা ও ঋণসুবিধার আওতাভুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তত্পরতা জরুরি। ঝিমিয়ে পড়া ব্যবসায়-কাঠামো এবং দেশি শিল্পের বিকাশসাধনের লক্ষ্যে করছাড়, কর অবকাশ, ব্যবসায়-প্রণোদনার মতো উদ্যোগগুলো শিল্পোদ্যোক্তাদের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারে।

অতিমারির বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রতি মনোযোগী হতে হবে, এ লক্ষ্যে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যবসায়ী মহলের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা কৌশল পালনের মাধ্যমে লকডাউনের মধ্যেও কুরিয়ার সেবা ও অনলাইনে পণ্য সরবরাহ সেবা খোলা রেখে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করা গেলে গতি ফিরবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

চলমান করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে আসার আগ পর্যন্ত ব্যবসায়বান্ধব এসব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতি বাঁচলে বাঁচবে দেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ