বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের ‘প্রাণ’ কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। কবির সেই সুন্দর ভুবন আর সুন্দর নাই। মানুষের মধ্যে সেই প্রেম ও ভালোবাসা নাই। তাহা না হইলে ভালোবাসার নামে একজন পুরুষ কীভাবে একজন নারীকে ধর্ষণ করিতে পারে? ধর্ষণের পর করিতে পারে খুন? দেশে প্রতিদিনই ধর্ষণ ও খুনখারাবির যেই সকল খবর পাওয়া যাইতেছে তাহা উদ্বেগজনক। গতকাল ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ), কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার), স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) ও শরণখোলায় (বাগেরহাট) ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গিয়াছে। এক সপ্তাহ বা এক মাসের পত্রপত্রিকায় চোখ বুলাইলে সমগ্র দেশে ধর্ষণসংক্রান্ত যেই চিত্র পাওয়া যাইবে, তাহা আরো উদ্বেগের কারণ হইবে নিঃসন্দেহে। আবার ইহাও সত্য যে, এই রকম অনেক খবর শেষ পর্যন্ত পত্রিকায় আসে না। সেই পরিসংখ্যান না তুলিয়া ধরিয়াও আমরা বলিতে পারি, এত লেখালেখির পরও দেশে এইরূপ অপরাধপ্রবণতা মোটেও কমিতেছে না। শুধু বাংলাদেশে নহে, উন্নত-অনুন্নত সকল দেশেই ইদানীংকালে ধর্ষণের ঘটনা বাড়িয়া চলিয়াছে যাহা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। তবে কি সমাজে এইরূপ অপরাধ প্রতিরোধে প্রচলিত আইনকানুন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে? বিদ্যমান দণ্ডবিধি হইয়া উঠিয়াছে অকার্যকর?
ধর্মে, বিশেষত ইসলামে নারী-পুরুষ সমাজে কীভাবে চলাফিরা করিবে তাহার বিধান দেওয়া হইয়াছে। বলা হইয়াছে উভয়কে পর্দা করিবার কথা। ধর্ষণ ও খুনখারাবির শাস্তি কী হইবে তাহাও বলিয়া দেওয়া হইয়াছে সুস্পষ্টভাবে। অনেকের মতে, ধর্মের এই নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান না থাকিলে সমাজ আজ বসবাসের অযোগ্য হইয়া পড়িত। পৃথিবীতে দেখা দিত ভয়াবহ বিপর্যয়। প্রতিদিন মফস্সল এলাকায় কোনো না কোনো ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতেছে। সরকারি দলের এক শ্রেণির লোক যেমন অন্যদের মারিতেছে, তেমনি তাহারা নিজেরা নিজেরাও মারামারি করিতেছে। কোথাও কোথাও তাহারা জনগণের রোষানলে পড়িতেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপরও কেহ কেহ চড়াও হইতেছে। কারণ তাহারা অন্যায়ভাবে সরকারদলীয় লোকদের পক্ষাবলম্বন করিতেছেন বা পকেটে ইয়াবা ঢুকাইয়া দিয়া অন্যায়ভাবে মানুষকে গ্রেফতার করিতেছেন, হয়রানি করিতেছেন। কথায় বলে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। অর্থাত্ সকাল দেখিয়াই দিনটি কেমন যাইবে তাহা উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবী নামক গ্রহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত সুন্দর দেশ আর কোথাও নাই বলিয়া অনেকের অভিমত; কিন্তু সেইখানেও সাদা-কালোর বিরোধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়া আছে।
ধর্ষণ ও খুনখারাবির প্রচলিত বিধান যেইখানে ব্যর্থ, সেইখানে বিশেষ করিয়া ইসলামে এই ব্যাপারে কী শাস্তির বিধান দেওয়া হইয়াছে? আমাদের ধর্ম অনুযায়ী ব্যভিচারের চাইতেও ভয়ংকর অপরাধ হইল ধর্ষণ। ব্যভিচারের শাস্তি বিবাহিতের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে পাথর মারিয়া মৃত্যুদণ্ড আর অবিবাহিতের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত করা। আর ধর্ষকের শাস্তির ব্যাপারে রহিয়াছে দুই রকম মত। হয় ব্যভিচার অথবা মুহারাবার শাস্তি প্রযোজ্য হইবে। মুহারাবার শাস্তি হইল তাহাদের হত্যা করা বা শূলে চড়ানো অথবা তাহাদের হাত-পা বিপরীত দিক হইতে (ডান হাত বাম পা বা বাম হাত ডান পা) কাটিয়া দেওয়া কিংবা দেশান্তর বা নির্বাসনে পাঠানো। আল কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী ইহা তাহাদের জন্য দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর পরকালে তাহাদের জন্য রহিয়াছে আরো কঠোর শাস্তি। এদিকে সম্ভ্রম রক্ষা করিতে গিয়া যিনি নিহত হন, ইসলাম তাহাকে শহিদের মর্যাদা প্রদান করিয়াছে। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে বাঁকা চোখে দেখিতে বা কটূক্তি করিতে নিষেধ করিয়াছে। কেননা তিনি মজলুম বা অত্যাচারিত। অন্যদিকে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষের জীবনের দাম যেহেতু অত্যধিক, তাই বিনা দোষে হত্যাকাণ্ডকে ভয়াবহ অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হইয়াছে। এই জন্য দেওয়া হইয়াছে কিসাসের মতো কঠোর শাস্তির বিধান অর্থাত্ মৃত্যুদণ্ড। সমাজে যখন খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ মহামারি আকার ধারণ করে, তখন তাহার মূলোত্পাটন করিতে প্রয়োজনে আরো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কি কোনো উপায় থাকে?
