শিল্পকলা একাডেমির আট জন কালচারাল অফিসারের বদলির আদেশ দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। তবে এ ধরনের বদলি করার এক্তিয়ার মন্ত্রণালয়ের নেই বলে দাবি করেছে শিল্পকলা একাডেমি। আর এ নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন বদলির আদেশ পাওয়া সেই কর্মকর্তারা।
এদিকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা বদলি করা মন্ত্রণালয়ের এক্তিয়ারবহির্ভূত বলে মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান হলেও শিল্পকলা একাডেমির যাবতীয় কার্যক্রম মহাপরিচালকের মাধ্যমেই করতে হবে। এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের অধীন; তারা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করেন না। এখানে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয় এমন কোনো নির্দেশ দিলে তা জটিলতাই সৃষ্টি করবে।
এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, নিয়ম মেনেই এ আদেশ দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা আইন মেনেই এ আদেশ দিয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির পরিষদে এই ১০ কর্মকর্তার বদলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত বেশ কয়েক জন সদস্য বলছেন, বদলি করার বিষয়ে সভায় আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং শিল্পকলা একাডেমির জনবলের সংকট কোন পর্যায়ে রয়েছে তা মহাপরিচালককে পরবর্তী সভায় তা জানাতে বলা হয়েছিল। সে সময় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব বিষয়টি তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। পরে মন্ত্রণালয় এককভাবে আদেশের বিষয়টি যুক্ত করেন।
এ সিদ্ধান্ত যে আলোচনা না করেই নেওয়া হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, তা উল্লেখ করে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ইত্তেফাককে বলেন, শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া যদি এ আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ যাদের বদলি করা হয়েছে তারা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করেন না। তারা পরিষদের অধীনে কাজ করেন।
এদিকে বদলির আদেশ নিয়ে রিট করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কালচারাল অফিসার বলেন, ‘আমাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে শিল্পকলা একাডেমি পরিষদ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিতে পারে না। শিল্পকলা একাডেমি আইনের ১৯ দশমিক ১-এ বলা আছে, এই পরিস্থিতিতে পরিষদ মহাপরিচালককে দায়িত্ব দেবে। কারণ আমরা পরিষদের অধীনে চাকরি করি, মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়।’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। সেই সুবাদে পরিচালনার পাশাপাশি একাডেমির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের মাধ্যমে। ২৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন করেন পরিষদের সদস্যসচিব হিসেবে নিযুক্ত একাডেমির মহাপরিচালক, যার সভাপতি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী। তবে শিল্পকলা একাডেমি আইনের লঙ্ঘন ঘটিয়ে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটিতে কর্তৃত্ব আরোপের অভিযোগ উঠেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে।
শিল্পকলা একাডেমি সূত্র জানিয়েছে, এ বছরের ৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সভা। সেই সভায় অভিযোগ করা হয়, অনেক কালচারাল অফিসার জেলায় দায়িত্ব পালন না করে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের জেলায় বদলি করা নিয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, দেশে ৪৬ জন কালচারাল অফিসার ৬০ জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি চারটি জেলায় কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আর ঢাকায় ১৫ জন কালচারাল অফিসার দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মূল অফিসে প্রথম শ্রেণির ৭১ জন কর্মকর্তার পদ থাকলেও মাত্র ২৮ জন পদে বহাল রয়েছেন। এর পাশাপাশি ১৫ জন কালচারাল অফিসার দিয়ে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। তার মানে, ৪৩টি কর্মকর্তার পদ একেবারেই খালি। সেখানে ১৫ জন কালচারাল অফিসারকে দিয়ে এই ৪৩ জন অফিসারের কাজ চালানো হচ্ছে।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ইত্তেফাককে বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির কাজের পরিধি বেড়েছে। অনুষ্ঠান থেকে সব পর্যায়েই কাজের পরিমাণ বেড়েছে। সেখানে লোকবল আরো জোগান না দিয়েই যারা কাজ করছেন, তাদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো মানে নেই। আমাকে কাজ চালিয়ে নিতে হলে লোকবল তো লাগবে। এভাবে লোক সরিয়ে নিলে কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। লোকবল না বাড়িয়ে এদের সরিয়ে নেওয়া ঠিক হবে না।’ লোকবল নিয়োগের কথা বলে শিল্পকলা একাডেমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন মহাপরিচালক।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘সভায় সেদিন বদলির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি উত্থাপন করেন, আমি সমর্থন করি। শিল্পকলার লোকবল নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যা পরবর্তী সভায় আলোচনা করা হবে।’
পরিষদের সদস্য বিশিষ্ট সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সেদিনের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আমার মনে হয় বদলি নিয়ে পানি ঘোলা না করে শিল্পকলা একাডেমির লোকবল বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক। একজন কালচারাল অফিসার দিয়ে দুই জেলা বা তিন জেলার কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, এটা হতে পারে না। এভাবে কাজ ভালোভাবে চলতে পারে না। আবার ঢাকায়ও লোকবলের অভাব। এখানেও কাজ চালাতে সবাই হিমশিম খাচ্ছে। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ ভালোভাবে চলতে পারে না।’ পরিষদের আরেক সদস্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ দুলাল ইত্তেফাককে বলেন, এ বিষয়ে সেদিন আলোচনা হয়েছে; কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়নি। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ কালচারাল অফিসারদের বদলি করার কথা বলেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বিষয়টি সমর্থন করেন। তবে সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল আগেই বদলি না করে শিল্পকলার লোকবল কেমন আছে আগামী সভায় শিল্পকলার মহাপরিচালককে জানানোর প্রস্তাব করেন। বিষয়টি সেখানেই থেমে যায়।
