যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, হাহাকার। মানুষের খাবার নেই, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা। সদ্য স্বাধীন দেশে চারপাশে কেবল অভাব-অনটন-সংকট। এই কঠিন সময়ে দেশ পুনর্গঠনের প্রস্তরকঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে হাত দিয়েছিলেন স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার কাজে। শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সাড়ে তিন বছরে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকখানিই। কিন্তু উন্নয়নের গতি থামিয়ে দিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র।
ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ে চোরাবালিতে পথ হারায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২১ বছর পর ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতা ফিরে পায় দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে মনোনিবেশ করে দলটি। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলে উন্নয়নের পথে। কিন্তু ২০০১ সালে ফের ঘটে ছন্দপতন। নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে দেশ চলে যায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধশক্তির হাতে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। আওয়ামী লীগ প্রায় ১০ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার ফলে নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অর্জন করেছে অভাবনীয় সাফল্য।
২০০৯ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। ২০১৭ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ ৯ বছরে রিজার্ভ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়। ভারতের পরই আমাদের অবস্থান। দারিদ্র্যকে আমরা জয় করতে পেরেছি। আমাদের আয় বেড়েছে, বেড়েছে ক্রয়ক্ষমতা। আমি মনে করি, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধুকন্যার সাহসী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপের কারণে বাস্তবায়ন হতে শুরু করেছে নানা মেগা প্রকল্প। দেশ এগিয়ে চলেছে সমৃদ্ধির পথে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দক্ষিণবঙ্গের কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবের পথে। সারাদেশে ১০০টি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ করছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। এটি দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দেবে। মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, স্যাটেলাইট প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পও বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। মেট্রোরেল হলে ঢাকা মহানগরীতে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসের নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (কুতুবখালী) পর্যন্ত যাবে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে।
উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি বিদ্যুত্। বিদ্যুত্ ছাড়া আমাদের একদিনও চলবে না, ইন্ডাস্ট্রি অচল হয়ে যাবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ পেতে হলে উত্পাদন বাড়াতে হবে। তাই হাতে নেওয়া হয়েছে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুত্ প্রকল্প ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্প। পুরোদমে এগিয়ে চলেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের কাজ। দেশে গ্যাসের মজুদ কমে আসায় আওয়ামী লীগ সরকার কক্সবাজারের মহেশখালীতে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। মহেশখালীর টার্মিনাল ছাড়াও আরো চারটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
পায়রা সমুদ্র বন্দরটি পুরোপুরি চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ ছাড়া পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা সৈকত পর্যন্ত চার লেন বিশিষ্ট সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে পায়রা বন্দরের সঙ্গে সুগম হবে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে রেলপথের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য জেলার সঙ্গে যুক্ত হবে পায়রা বন্দর।
নারীর ক্ষমতায়নে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। নারীরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে নানা ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে। দেশের উন্নয়নে তারা সমান অংশীদার। দেশের চার হাজার ৫৪৭টি ইউনিয়নে চালু হয়েছে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। এসব সেবাকেন্দ্রে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য, ভর্তি ফরম পূরণ, জন্ম নিবন্ধন, বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ, মোবাইল ব্যাংকিংসহ দৈনন্দিন ৬০ ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কখন কোন ফসল বপন করতে হবে, কিভাবে রোগবালাই প্রতিরোধ করা যাবে, কৃষি সংক্রান্ত এসব তথ্য সহজেই জানতে পারছেন কৃষকরা। ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষ নানা সেবা পাচ্ছে, এটি একটি বড় অগ্রগতি। ভর্তি ও চাকরির আবেদন এখন মাউসের নাগালে। বিদেশে গমনেচ্ছুরা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারছেন ঘরে বসেই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরকারি ওয়েবসাইট জাতীয় তথ্য বাতায়নে ৪৩ হাজার দপ্তর যুক্ত। এসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অফিসের নানা কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যাচ্ছে ঘরে বসেই। জেলা ই-সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমেও বিভিন্ন সেবা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এসব পদক্ষেপ ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ও সমৃদ্ধির কথা ভেবে প্রণীত হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শতবর্ষী মহাপরিকল্পনা ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’। দেশকে ভালোবাসলে, দেশের মানুষকে ভালোবাসলে, দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থাকলে, জনগণের জন্য নিবেদিত প্রাণ হলেই না একজন রাষ্ট্রনায়ক শুধু বর্তমান নয়, অদূর ভবিষ্যতে তার অবর্তমানে প্রাণপ্রিয় দেশটির কী হবে সে কথাও ভাবেন। আর তারই ফলশ্রুতি এ প্রকল্প। যে শিশুটির এখনও জন্ম হয়নি তার কথা ভেবেই এই প্রকল্প। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এখন বাস্তবতা।
n লেখক: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
