জনসংখ্যা ও জনসম্পদ

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২১:২৯

 ‘ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা। ভারতের দার্জিলিং থেকে ‘ও’লেভেল করেছেন, রাজধানীর স্কলাস্টিকা থেকে ‘এ’ লেভেলও শেষ করেছেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ স্কুল অব ল থেকে আইনে স্নাতক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্যাসল শহরের North Ambriya University থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন সেই সঙ্গে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়েও নিয়েছেন স্নাতকোত্তর। দেশে ফিরে করলেন গরুর খামার। এখন গরুর খামারে বিদেশি জাতের ৪৮টি গরু আছে। এসব গরুর দাম এখন প্রায় ৬০ লাখ টাকা। শুধু তাই-ই নয়, গত কোরবানির ঈদে তিনি দেড় কোটি টাকা লাভও করেছেন। ‘গত দুই মাস আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় এমনটাই খবর এসেছিল বগুড়ার বাসিন্দা রাহাতুল খান নামে একজন যুবকের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সফলতার শিখরে পৌঁছানোর। শুধু এই রাহাত নয় আরো অনেক রাহাত আছে যারা ‘বেকার’ নামক শব্দটা পুড়ে ফেলে উদ্যোক্তা হয়েছেন। উচ্চশিক্ষিত হয়েও সরকারি চাকরির বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হননি। ২০১৬-১৭ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশে  ৪.২ শতাংশ বেকার। আর এর অধিকাংশই শিক্ষিত বেকার। যার ফলে উদ্বেগের একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে চাকরি প্রত্যাশিত শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে।

ঢালাওভাবে শুধু একটা কথা সবাই বলে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণেই এত বেকার লোকের সৃষ্টি। আসলে জনসংখ্যা নাকি অদক্ষ জনসমষ্টি? এমন প্রশ্ন প্রায় সকলের মনে অনেক সময় হয়তো নাড়া নাও দিতে পারে। উত্তর এটাই আমাদের দেশে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ চীনের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। চীনের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৩৮ কোটি। এই বিশাল জনসংখ্যা দিয়ে চীন বিশ্ব বাণিজ্যে একতরফা কাঠি ঘুরানোর চেষ্টা করছে। বলা যেতে পারে যে, সে দেশের আয়তন জনসংখ্যা অনুপাতে ঠিক আছে। কিন্তু উত্তর আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশের দিকে তাকান, যেসব দেশ ভৌগোলিকভাবেও অনেক প্রশস্ত আবার জনসংখ্যাও কম। যেমন—মালি, সাদ, আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নাইজার প্রভৃতি দেশ যারা এখনো গরিব। এসব  দেশের একটাই সমস্যা দক্ষ জনবলের অভাব। সুতরাং সেদিক থেকে বলা যায় জনসংখ্যা কম-বেশি বা ভৌগোলিক সীমারেখার ক্ষুদ্রায়তন দেশের প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নে খুব বেশি প্রভাব রাখে না। বরং দরকার দক্ষ জনবল যা দিয়ে একটি দেশ সমৃদ্ধ হতে পারে। একজন ব্যক্তি নিজে দক্ষ হলে সে শুধু নিজের উপকারই করে না বরং দেশের প্রবৃদ্ধিতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ১১৫টারও অধিক দেশে জনসংখ্যা রপ্তানি করা হচ্ছে। যাদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের প্রবৃদ্ধিকে এক ধাপ উপরে উঠিয়েছে। দেশে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা এখন। বিবিএসের তথ্য মতে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কর্মক্ষম কিন্তু শ্রমশক্তির বাইরে। এই কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগানো গেলে দেশের প্রবৃদ্ধি আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে আসবে। জনসংখ্যা তখনই জনসম্পদ হবে যখন এর বাস্তবমুখী ব্যবহার্যতা থাকবে। জনসম্পদ নির্মাণেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া  আবশ্যক। যেমন—১. সময়োপযোগী শিক্ষা এবং বাস্তবমুখী জ্ঞান প্রদান। ২. কারিগরিভাবে শিক্ষার প্রসার আরো বাড়ানো এবং তাদের জন্য কর্মখাত গড়ে তোলা। ৩. উত্পাদনশীল কর্মকাণ্ডে উত্সাহ প্রদান ও আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রদান। ৪. আমাদের দেশটি যেহেতু কৃষি প্রধান দেশ এবং শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ লোক কৃষি কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সুতরাং এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আধুনিক কৃষিভিত্তিক জ্ঞান প্রদান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৫. যেহেতু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেশি সুতরাং প্রথাগত সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষা না দিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান আবশ্যক। ৬. সব অবকাঠামো শহরমুখী না করে কিছু কিছু অবকাঠামো গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ে গড়ে তোলা আবশ্যক যাতে করে কর্মসংস্থান হয় এবং শহরে জনসংখ্যার চাপ কমে আসে।

সুতরাং জনসংখ্যাকে অভিশাপ মনে না করে এগুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার করে জনসম্পদে রূপান্তর করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়