টিভি চ্যানেলের ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্মগুলো

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৭

মাসুদ সেজান। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল একজন নাট্যকার ও নির্মাতা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছেন। বাংলা নাটকের নানামুখী সঙ্কটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সুস্থ বিনোদনের আলোকবর্তিকা হিসেবে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর ‘এইম ইন লাইফ’, ‘লংমার্চ’, ‘চলিতেছে সার্কাস’সহ অসংখ্য দর্শকপ্রিয় নাটক এখনো মানুষের মুখে মুখে। মাসুদ সেজানের এই সময়ের কাজ, নাট্য-ভাবনা ও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন খালেদ আহমেদ

 

বর্তমানে আপনি কী কাজ করছেন?

বাংলাভিশনে ‘খেলোয়াড়’ নামে আমার একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হচ্ছে। প্রতি রবি ও সোমবার রাত ৯টা ৫ মিনিটে এটি দেখানো হয়। এছাড়া আগামী ঈদের জন্য বিভিন্ন চ্যানেল থেকে প্রস্তাবনা আসছে, সেগুলোর মধ্যে কোনটা করব, কোনটা করব না, তা যাচাই-বাছাই করছি। ওয়ের সিরিজের প্রস্তাবনা আসছে। ওইসব নিয়েও ভাবছি।

সম্প্রতি সবাই শর্টফিল্ম ও ওয়েব সিরিজের দিকে ঝুঁকছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

হুজুগ হিসেবে দেখছি। আমরা একেক সময় একেকটা হুজুগের মধ্যে ঢুকে পড়ি। একটা সময় যেরকম ঘটি-বাটি বন্ধক রেখে সবাই শেয়ার বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, অনেকটা সেই রকম। কাজ জানা, কাজ না-জানা, ব্যর্থ, বাতিল, হতাশাগ্রস্ত, বেকার হয়ে পড়া নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাই এখন শর্টফিল্ম আর ওয়েব সিরিজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, নিম্নমানের নাটকগুলোকেই এরা মোড়ক পরিবর্তন করে অনলাইনের অ্যাপসে, ওয়েব পেজে, ইউটিউবে নাম দিচ্ছে শর্টফিল্ম, ৭/৮ পর্বের একটি নাটক বানিয়ে নাম দিচ্ছে ওয়েব সিরিজ। কিন্তু আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে, শিল্প ও সংস্কৃৃতিতে তারা বড় ধরনের কোনো বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে।

আপনি কি তাহলে নতুন এই জোয়ারের মধ্যে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না?

একদমই না। বরং আরও অধঃপতন দেখতে পাচ্ছি। নতুন মোড়ক দেখে, এমবি খরচ করে দেখতে হচ্ছে বলে, দর্শক হয়তো প্রথমে কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠছেন, কিন্তু আমি নিশ্চিত অতি শীঘ্রই তারা হতাশায় নিমজ্জিত হবেন। কারণ, এখানে নতুন চিন্তার কোনো খোরাক নেই, শিল্পের আলাদা বাঁকের কোনো আভাস নেই। আছে স্থূলতার প্রতিযোগিতা, আছে অশ্লীলতার তথাকথিত স্মার্টনেস, যা আমাদের বাঙালি দর্শক বেশিদিন গ্রহণ করবেন বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, দর্শককে আকৃষ্ট করতে সিনেমার কাটপিস কৌশলও বেশিদিন টিকেনি।

টিভি চ্যানেলগুলোর বিকল্প হয়ে যাচ্ছে কনটেন্ট প্লাটফর্মগুলো। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

আপাতদৃষ্টিতে অনেকে তা-ই ভাবছেন। কিন্তু সেটা কখনোই সম্ভব না। দুটি দুই মাধ্যম। সময়ের প্রেক্ষিতেই এই টেকনোলজি, এই কনসেপ্টগুলো আমাদের সামনে চলে এসেছে। এটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বলা যেতে পারে, টেলিভিশন চ্যানেলের ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছে প্লাটফর্মগুলো। সুযোগ বলছি এই অর্থে, আমরা অনেকেই এই সম্ভাবনাময় মাধ্যমটিকে মিসইউজ করছি। টেলিভিশনে যেটুকু শৃঙ্খলা অবশিষ্ট আছে, এখানে তার কোনো বালাই নেই। ফলে একদল বিকৃত রুচির মানুষও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কলকাতার মিডিয়া পাড়ায় একটা কথা চালু হয়েছে, ‘প্লাটফর্মগুলো এসে মা-মাসি সব এক করে দিয়েছে।’ অর্থাত্ সর্বনাশের যে ঘটনাটি ঘটছে, কে প্রকৃত শিল্পী, আর কাকে আমরা বেহুদা তারকা বানিয়ে দিচ্ছি, তার কোনো ভেদাভেদ করা যাচ্ছে না। একটি সুস্থ সংস্কৃতির জন্য এটি অবশ্যই বড় ধরনের হুমকি।

তাহলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

প্লাটফর্মগুলোকেও যেমন এর দায়িত্ব নিতে হবে, যারা প্রকৃত শিল্পী ও নির্মাতা আছেন, তাদেরও সচেতন হতে হবে। দর্শককে আমরা কী দেখাব, কী দেখাতে চাই? সস্তা হুজুগে নয়, স্রোতে গা ভাসিয়ে নয়, জেনে বুঝে দেশ-জাতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সবার কাজ করা উচিত।

আপনার চলচ্চিত্রের খবর কী?

সবকিছু নিয়ে বসে আছি, শুধু টাকা নেই। যাদের টাকা আছে, যারা টাকা দিতে চায়, সঙ্গে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেয়, টাকা নিতে আর ইচ্ছা করে না। আমি আমার মতো করে একটি ফিল্ম বানাতে চাই, এখানেই তাদের আপত্তি। আর আমার আপত্তি হচ্ছে, আমি অন্য কারও মতো করে ফিল্ম বানাব না। কাজেই জট খুলছে না। বাকিটা দেখা যাক।

ছবি শামছুল হক রিপন