একটি জলের খনি

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২১:০৬

 ‘একটি জলের খনি

তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী।’

‘নিঃসঙ্গতা’ শীর্ষক কবিতাটির কথা মনে আছে। অনেক কিছু চায়নি যে বালিকা, সে কী চেয়েছিল? বালিকা বাড়ন্ত শরীর নিয়ে বসেছিল আয়নার দাঁড়ে, সেই দৃশ্য দেখে মা বকুক আর বাবা তার বেদনা দেখুক—এই চেয়েছিল? জলের খনি যদি বালিকাকে তৃষ্ণা দেয়, সে তৃষ্ণা মেটাতে পারত। একজন পুরুষ তাকে রমণী বিবেচনায় নিলেই চলত! বাংলা কবিতার অকালপ্রয়াত কবি আবুল হাসানের আমি ভক্ত হয়ে উঠি সেই আমার উঠতি বয়সেই। মাত্র আটাশ বছরের জীবদ্দশায় কী মায়াময় কবিতা লিখে হাসান চলে গেছেন। তবু সেই আটাশ বছরেই কী সব দুর্দান্ত কবিতার জনক আবুল হাসান। হাসান বলেছেন, ‘প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে মনেও রাখবে না,/ আমি কে ছিলাম কী ছিলাম—/ কেন আমি/ সংসারী না হয়ে খুব রাগ করে হয়েছি সন্ন্যাসী,/ হয়েছি হিরন দাহ, হয়েছি বিজন ব্যথা, হয়েছি আগুন!’ কিংবা ‘হেমন্তে হলুদ পাতা যেরকম ঝরে যায়,/ ও এখন সেরকম ঝরে যাবে’—ও বলতে ‘লোকটা’; যাকে নিয়ে হাসান বলছেন, ‘বনভূমিকে বলো, বনভূমি, ওইখানে একটি মানুষ/ লম্বালম্বি শুয়ে আছে, অসুস্থ মানুষ...’। কিংবা মনে আছে—‘পাতাকুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছ? ...ছায়া, আমি ছায়া কুড়োই।’

প্রায় ত্রিশ বছর আগে পড়া আবুল হাসানের কবিতা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে। আরো কত যে কবিতা, আবুল হাসানের কবিতা আমার মুখস্থ হয়ে আছে! সম্ভবত আর কোনো কবির কবিতা আমার এভাবে মনে থেকে যায়নি। হাসানের কবিতার বিষণ্ন-মধুর আলুলায়িত জ্যোত্স্নায় পুড়তে পুড়তে আমিও প্রেমে পড়েছিলাম। শিশির ভিজিয়ে দিয়েছিল সমস্ত শরীর। বাংলা কবিতাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। এতে তরুণ কবি আবুল হাসানের উস্কানি ছিল ঢের। এই উস্কানিই আবুল হাসানের কবিতার শক্তি। গত শতকের লেইট সিক্সটিজে উদ্ভাসিত আবুল হাসানের জীবদ্দশায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র তিনখানা। রাজা যায় রাজা আসে, যে তুমি হরণ করো ও পৃথক পালঙ্ক। অসম্ভব প্রতিভাবান কবি আবুল হাসান। মাত্র ১০ বছরকাল তাঁর কবিতা রচনার সময়। ঈর্ষাযোগ্য কবি আবুল হাসান। সময়ের আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসানের বোহেমিয়ান জীবন সেসময় প্রায় মিথ হয়ে ওঠে। মিথ থেকে উঠে আসেন প্রজ্ঞাসুন্দরী সুরাইয়া খানম। কিন্তু বড় অকালেই হাসান আরো মিথ হয়ে যান তার প্রয়াণের মধ্য দিয়েই। বনানী গোরস্থানে আবুল হাসানের কবরে যে এপিটাফ লেখা আছে, সেই লেখা হাসানের কবিতাংশ—‘যতদূর যাও ফের দেখা হবে/ কেন না, মানুষ যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক। ২৬ নভেম্বর, ১৯৭৫।’ আর আবুল হাসান জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট।

হতে পারে, ২০০০ সালে আমেরিকা থেকে ঢাকায় ফেরা নির্গুণ-ভক্ত আমাদের বন্ধু মৃগাঙ্ক সিংহ একটা কবিতার বই বের করল। সেই কাব্যগ্রন্থের নাম ‘নির্মলেন্দু গুণ’। বইয়ের ফ্ল্যাপ আমি লিখি। শিল্পী মাসুক হেলাল প্রচ্ছদ করেন ‘নির্মলেন্দু গুণ’ কাব্যগ্রন্থের।  তো একরাতে আমরা করলাম যে কী! মৃগাঙ্ক বলল, ‘নির্মলেন্দু গুণ’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা উত্সব করতে হবে। কোন অডিটোরিয়ামে করা যায়, অতিথি কারা থাকবেন, অডিয়েন্স কারা হতে পারে... ইত্যাদি আলোচনার পর আমার প্রস্তাব মৃগাঙ্ক খুশি মনেই মেনে নেয়। প্রস্তাব হচ্ছে, ‘নির্মলেন্দু গুণ’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা উত্সব হবে রাতে, বনানী কবরস্থানে, আবুল হাসানের কবরের মধ্যে বসে। চাঁদের আলো আর কবরস্থানের সোডিয়াম আলোয় আমরা নতুন কবিতার বই ‘নির্মলেন্দু গুণ’ থেকে কবিতা পড়ব, আমরাই শুনব। কবিতা পড়ার সঙ্গে আমরা আকণ্ঠ নিমজ্জিত হবো, যেন বা চাঁদের গায়ে লেগে থাকা শিশিরকণা সারারাত পান করে চলব। তা-ই করেছি আমরা। আবুল হাসানের কবরের মধ্যে সেই রাতে মৃগাঙ্ক সিংহ, মারজুক রাসেল, আলফ্রেড খোকন ও আমি—আমরা চার বন্ধু মিলিত হয়েছিলাম। এমনকি কবরের মধ্যে বসে কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা উত্সবের ফাঁকে রাত ৩ টার দিকে ফোন করলাম কবি নির্মলেন্দু গুণকে। গুণ দা তখনো পলাশীতেই থাকতেন। সেই রাতের তথ্যচিত্র অন্যত্র লিখেছি, পরে আবার লিখব। এখন থাক।

এখন বলব সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গ্রন্থ নিয়ে। পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে কবি মোশতাক আহমদ লিখিত আবুল হাসান ডকু-ফিকশন গ্রন্থ ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ প্রকাশিত হয়েছে। আবুল হাসানের কবিতার সঙ্গে যাদের আলাপ বিস্তার আছে, তাদেরই পছন্দ হবে ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ পড়ে। আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, সুরাইয়া খানম ছাড়াও ঝিনুক নীরবে সহো’র মধ্যে ঢুকে পড়েছেন আহমদ ছফা, শহীদ কাদরীসহ তদানীন্তন অনেকেই। সব মিলিয়ে কী দাঁড়াচ্ছে? কী দাঁড়ালো?

কবি আবুল হাসান আমাদের অন্তরে ঠাঁই পেয়েছেন পরম ভালোবাসায়। একজন কবির জন্যেই তো এই ভালোবাসা থাকবে, সেটাই প্রজ্ঞাবিধান। কেননা, কবি সেই, যার উপরে দায়িত্ব বর্তেছে, ‘ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও’।